এআই আপনাকে বেকার করে দেবে? পথ দেখালেন রঘুরাম রাজন!
অতীতেও যখন প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হয়েছে, তখন ভাবা হয়েছিল যে মানুষ হয়ত বেকার হয়ে যাবে কিন্তু তার বদলে মানুষেরই কাজের অনেক সুবিধে হয়েছে। ঠিক সেভাবেই ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ হারানোর আশঙ্কা থাকলেও এরমধ্যে নিশ্চয়ই মানুষ প্রযুক্তির দাস না হয়ে কাজ শেখার চেষ্টা করবে। এমনই আশা রাজনের।

কলকাতা : ছবি আঁকা হোক বা কোনও মিউজিক বানানো, বা কোনও ট্রেন্ডিং সোশ্যাল মিডিয়া টপিক – সব কিছুর একমাত্র সলিউশন ‘Artificial Intelligence (AI)’। চ্যাটজিপিটি বা গুগল জেমিনি এখন যেকোনও প্রশ্নের উত্তর চটজলদি দিয়ে দেয়। এই চটজলদি সমাধানই এখন উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পৃথিবীর এক বড় অংশের কাছে। কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা (AI) যেভাবে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে, তাতে মনে হচ্ছে যেকোনও দিন মানুষের জায়গা মেশিন দখল করে নেবে। এই বিষয়েই গবেষণা সংস্থা Citrini-র একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে,”২০২৮ সালের মধ্যে বেশির ভাগ ‘হোয়াইট কলার’ কাজ বা অফিস ভিত্তিক কাজে অংশগ্রহণ করে কর্মচারীদের বেকার করে দিতে পারে।” তবে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও আরবিআই-এর প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম জি রাজনের মতে, “বিষয়টা এখনই এতটা ভয়ঙ্কর পর্যায়ে যায় নি। ভবিষ্যৎ এতটা সহজ না।” রাজনের মতে, AI নিয়ে যে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে সেটির বেশিরভাগই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হচ্ছে এবং এর ফলে যেটি আসল ঝুঁকি অর্থাৎ এআই-এর আরও নানা বিভাগে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা – এই বিষয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না, যা চিন্তার বলে মনে করা হচ্ছে।
নিজের লেখা নিবন্ধ Are We Facing AI Nightmare এ তিনি উল্লেখ করেছেন, মানুষ যতটা দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নিয়ে ভয় পায়, তত জলদি এটা ঘটে না। প্রযুক্তি ধীরেধীরে এগোলেও, বিভিন্ন কারণে এটি ঘটতে সময় লাগে। কারণ সরকারি আইনি প্রক্রিয়া ও লাইসেন্সের কারণে দ্রুত এই পরিবর্তন করা কঠিন। কারণ, এই পরিবর্তনের পিছনে রয়েছে এক বিশাল অর্থনৈতিক খরচ। নতুন প্রযুক্তি আনতে গেলে দরকার বিনিয়োগ।তবে তাঁর প্রশ্ন অন্য জায়গায়। নিজের লেখায় তিনি বলছেন,”AI যদি সব কাজ শিখে যায়, তাহলে চাপের বিষয় অবশ্যই। যদি প্রাথমিক স্তরের কাজ AIকে দিয়েই হয়ে যায়, তাহলে নতুন কর্মীরা কাজ শিখবেন কিভাবে ? কাজ হারানোর চেয়েও বড় ভয় হল ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হয়ে পড়ার মানসিক চাপ, যা সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।” তিনি মূলত বলতে চেয়েছেন একটি প্রযুক্তির ‘কাজ করতে সক্ষম হওয়া’ ও ‘পুরো বাজার দখল করা’ – দুইয়ের মধ্যে তফাৎ আছে। হয়ত AI খুব ভাল আর্টিকেল লিখতে পারে, কিন্তু সেই টুল কোনোদিনই মানুষের মত করে ভাবতে পারবে না ও কোনও গাণিতিক বা আর্থিক সমাধানে মানুষের সমতুল্য নয়। এছাড়াও প্রশ্ন উঠছে, যদি এই টুলের জন্য কোনোদিন কোনও প্রতিষ্ঠানের বহু টাকার ক্ষতি হয়, তখন দায়ী কে হবে ? এই নিয়ে দ্বিধার কারণেই কোনও বড় কোম্পানি মানুষের বদলে কোন কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তাকে দায়িত্ব দেবে না।
রাজন মনে করিয়ে দিচ্ছেন, অতীতেও যখন প্রযুক্তিগত পরিবর্তন হয়েছে, তখন ভাবা হয়েছিল যে মানুষ হয়ত বেকার হয়ে যাবে কিন্তু তার বদলে মানুষেরই কাজের অনেক সুবিধে হয়েছে। ঠিক সেভাবেই ২০২৮ সালের মধ্যে কাজ হারানোর আশঙ্কা থাকলেও এরমধ্যে নিশ্চয়ই মানুষ প্রযুক্তির দাস না হয়ে কাজ শেখার চেষ্টা করবে। এমনই আশা রাজনের। রাজন মনে করেন, আসল বিপদ প্রযুক্তি নয়, প্রযুক্তির মালিকানা। যদি আজ হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি এআই পেয়ে যায়, তারা যেমন বাজারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নেবে, তেমনই ব্যবহারের জন্য সাধারণ মানুষকে চড়া মূল্য দিতে হবে। এবং যেহেতু কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ফলে হোয়াইট কলার জব থাকবে না, তাই শ্রমভিত্তিক কাজ বেড়ে যাবে। কর্মী বাড়ার ফলে কমে যাবে মজুরি, যা চিন্তার বিষয়।
রাজন বিশ্বাস করেন, যদি প্রযুক্তির কারণে বেকারত্ব তৈরি হয়, এর ফায়দা নেবে রাজনৈতিক দলগুলি কারণ তাদের রাজনৈতিক তাগিদ থাকবে। তাঁর বিশ্লেষণ থেকে মনে হয়, হয়তো আমরা বুঝতে পারছি না আসল অসুবিধে। আসল প্রশ্ন হল, AI মানুষের কাজ কাড়বে নাকি এই প্রযুক্তি কার হাতে থাকবে এবং এর থেকে উৎপাদন হওয়া জিনিসের আসল লাভবান কারা হবে।
