‘জন অরণ্য’র হাত ধরে নতুন সত্যজিৎকে চিনিয়ে ছিলেন, ব্রাত্যর স্মৃতিচারণায় ‘এক ব্যাগ শংকর’

শংকরের উপন্যাস থেকে সত্যজিৎ রায় ছবিও করেছেন, জন অরণ্য', 'সীমাবদ্ধ'। 'জন অরণ্য' আমার অত্যন্ত প্রিয় সিনেমা। বইটাও পড়েছি। সিনেমাটাও অজস্রবার দেখেছি। যতবার সিনেমাটা দেখেছি, ততবার মনে হয়েছে, সত্য়জিৎ এই ছবিতে অনেক রুক্ষ, সত্যজিতের কোমলতা এখানে প্রায় নেই।

জন অরণ্যর হাত ধরে নতুন সত্যজিৎকে চিনিয়ে ছিলেন, ব্রাত্যর স্মৃতিচারণায় এক ব্যাগ শংকর

| Edited By: আকাশ মিশ্র

Feb 20, 2026 | 5:26 PM

শুক্রবার দুপুরে হঠাৎ বাঙালি হারাল তাঁর প্রিয় লেখক মণিশংকর মুখোপাধ্যায় ওরফে শংকরকে। স্তব্ধ হল চৌরঙ্গীর কলম। লেখকের স্মৃতিতে ভেসে গেলেন শংকরের গুণমুগ্ধ পাঠক তথা রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী, অভিনেতা, পরিচালক ব্রাত্য বসু। শংকরের গল্পের পাতা থেকে নস্ট্যালজিয়া ধার করে ধরলেন কলম।

বয়সটা তখন খুবই কম। ছোটবেলা থেকেই যেহেতু বই পড়তে ভালোবাসি, তাই বই উপহার পেতে ভালোই লাগত। উপহার হিসেবেই হাতে প্রথম পেয়েছিলাম ‘এক ব্যাগ শংকর’। এই এক ব্যাগ শংকর থেকেই, প্রথম আলাপ লেখকের সঙ্গে। মনে আছে, ওই এক ব্যাগ শংকরে বেশ কয়েকটি শিশু সাহিত্য়ও ছিল। শংকরকে প্রথম পড়েই, তাঁর লেখার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলাম। এরপর বয়স যখন একটু বাড়ে তখন হাতে পাই মণিশংকর মুখোপাধ্যায় তথা শংকরের প্রথম উপন্যাস ‘কত অজানারে’।

আমি ওই রকম উপন্যাস খুব কম পড়েছি। এখনও মনে আছে, কত অজানারে উপন্যাসে শংকর, একটি ট্রামের সঙ্গে সরীসৃপের তুলনা করেছিলেন। এখনও চোখের সামনে ভাসছে, তাঁর সেই লেখা। ডালহৌসি চত্বরে একটি ট্রাম আটকে পড়েছে। সেটা দেখে শংকরের মনে হয়েছিল, একটা আলাদা টাইমজোন, যা ট্রাফিক জ্যামে আটকে পড়েছে। এরপর থেকেই যেন শংকর ধীরে ধীরে আমার প্রিয় হয়ে উঠলেন। একের পর এক উপন্যাস পড়ে শেষ করে ফেলেছি। এক নাগাড়ে পড়ে গিয়েছি।

শংকরের উপন্যাস থেকে সত্যজিৎ রায় ছবিও করেছেন, ‘জন অরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’। ‘জন অরণ্য’ আমার অত্যন্ত প্রিয় সিনেমা। বইটাও পড়েছি। সিনেমাটাও অজস্রবার দেখেছি। যতবার সিনেমাটা দেখেছি, ততবার মনে হয়েছে, সত্য়জিৎ এই ছবিতে অনেক রুক্ষ, সত্যজিতের কোমলতা এখানে প্রায় নেই। সত্যজিতের যে ব্রাহ্ম চিন্তাভাবনা, সেটাও জন অরণ্যে অনুপস্থিত। আমার ধারণা শংকরের উপন্যাসের মধ্যেই সেই বিষয়টা ছিল, যা সোমনাথ, যে চরিত্রটি প্রদীপ মুখোপাধ্যায় করেছিলেন, কলকাতা শহরের যে সেন্স অফ ভ্যালু পাল্টাতে শুরু করেছে, শংকর চমৎকারভাবে তা জন অরণ্যে তুলে ধরেছিলেন। আমার মনে হয়, শংকরের লেখার মধ্যে দিয়ে আমরা অন্যরকম সত্যজিৎকে পেয়েছিলাম। অন্য সত্যজিৎ তৈরির অনুঘটকই ছিলেন যেন শংকর। তথা জন অরণ্য।

এছাড়াও শংকরের উপন্যাস থেকে মুম্বইয়ে সিনেমা হয়েছে, তাঁর উপন্যাস থেকে থিয়েটারও হয়েছে। সেটা বড় কথা নয়, শংকর এত বছর ধরে যে উপন্যাস লিখেছেন, ২০২১ সালে তিনি সাহিত্য একাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন। আমি মনে করি,আজকের সাহিত্য ভার্চুয়াল জগতের মুখে পড়ে সংজ্ঞা পালটে ফেলেছে। এরকমই এক সময়ে শংকরের লেখা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলা সাহিত্য যতদিন থাকবে, শংকরের মতো লেখক, বেঁচে থাকবেন। শংকরের স্মৃতিচারণা করতে বসলে, একটা কথা বার বার মনে হয়। শংকর বরাবরই কর্পোরেট হাউজে চাকরি করে সাহিত্য করেছেন। ফলে শংকরের লেখনি, দৃষ্টিভঙ্গির একটা তারতম্য ছিল। কিন্তু শংকর এতটাই জনপ্রিয় লেখক ছিলেন যে দিনের পর দিন তাঁর বই বেস্টসেলার হয়েছে। ফলে তিনি যে অন্য পেশায় ছিলেন, তা ধীরে ধীরে আবছা হয়ে গিয়েছে। তিনি অনেক ধর্মীয় বইও লিখেছেন, যেমন রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দকে নিয়ে অনেক গবেষণামূলক কাজ করে গিয়েছেন, সেই শংকর কিন্তু জন অরণ্য়র শংকর থেকে একেবারেই আলাদা। তাঁর এই লেখা, ধারাবাহিকতার মধ্যে দিয়েই শংকরকে আমাদের মূল্যায়ণ করতে হবে। তিনি সারাজীবন আমাদের মধ্যে থাকবেন।