টলিউডের সুদিন ফেরাতে একই কমিটিতে দেব-হিরণ, ১৯ জনকে বেছে নিল শুভেন্দুর দফতর?
নথি অনুযায়ী, বড়সড় প্রশাসনিক রদবদল ঘটতে চলেছে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের অধীনে। জানা গিয়েছে, এই দফতরের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রায় ৪০টি কমিটি ও সংস্থার কাজ এবার কড়া আতশ কাচের নিচে ফেলা হচ্ছে। অনেক সংস্থার কাজ একই ধরণের হওয়ায় সেগুলোকে এক ছাতার তলায় আনা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বৈঠকে উপস্থিত বিনোদন জগতের প্রতিনিধিদেরই।

ভোটের আবহে লড়তে দেখা গিয়েছে টলিউডের দুই হিরোকে। তবে একজন সিনেমা থেকে বেশ কিছু বছর দূরে থাকলেও, আরেকজন ‘মেগাস্টার’। হ্যাঁ, দেব-হিরণ। ইভিএমের যুদ্ধে বিজেপি বিধায়ক হিরণের সঙ্গে সাংসদ দেবের সংঘাত বরাবরই উঠে আসতে খবরেরব শিরোনামে। নানা সময়েই দুজনের বাকযুদ্ধে বাংলার রাজনীতিকে সরগরম করত। তবে এখন বাংলার রাজনীতির মঞ্চে বড় পালাবদল। হিরণ রয়েছেন বিজেপিতেই। কিন্তু দেব এখন তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআইতে যোগ দিয়েছেন। ভোট বাংলার সেই যুদ্ধ এখন অতীত। আর এবার টলিউডের সুদিন ফেরাতে, বাংলার ভোটের সেই দুই তারকা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এসে দাঁড়ালেন একই কমেটিতে। বিষয়টা একটু খোলসা করে বলা যাক।
টলিপাড়ার অন্দরে চলা দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কাটাতে এবার বড়সড় পদক্ষেপ করল নবান্ন। গত ৮ জুন রাজ্যের প্রশাসনিক সদরে অনুষ্ঠিত হওয়া একটি অতি-গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের ভেতরের তথ্য (Minutes of Meeting) এল প্রকাশ্যে। পশ্চিমবঙ্গ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন শিল্পের একাধিক সমস্যা এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের কার্যপ্রণালী নিয়ে আয়োজিত সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকের নথিতে মিলেছে টলিউডের ভবিষ্যৎ বদলের একাধিক তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত।
সেই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে টলিউড ও রাজনীতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে উপস্থিত ছিলেন তারকা-বিধায়ক রূপা গঙ্গোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায় এবং পাপিয়া অধিকারী। অন্যদিকে প্রশাসনের তরফে হাল ধরতে হাজির ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডাঃ সুব্রত গুপ্ত, ডিরেক্টর অফ ফিল্মস এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের একাধিক শীর্ষ আমলা।
কী কী আলোচনা হয়েছে এই বৈঠকে?
নথি অনুযায়ী, বড়সড় প্রশাসনিক রদবদল ঘটতে চলেছে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের অধীনে। জানা গিয়েছে, এই দফতরের নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রায় ৪০টি কমিটি ও সংস্থার কাজ এবার কড়া আতশ কাচের নিচে ফেলা হচ্ছে। অনেক সংস্থার কাজ একই ধরণের হওয়ায় সেগুলোকে এক ছাতার তলায় আনা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বৈঠকে উপস্থিত বিনোদন জগতের প্রতিনিধিদেরই। শুধু তাই নয়, এই সংস্থাগুলোর সভাপতি বা চেয়ারম্যানের মতো শীর্ষ পদাধিকারী হিসেবে যোগ্য ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে তাঁদের।
প্রশাসনিক এই সংস্কারের ছোঁয়া লাগছে সাধারণ মানুষের বিনোদন ক্ষেত্রেও। সরকারি অডিটোরিয়াম ও হল বরাদ্দের চেনা চকে বড় বদল আসছে। এবার থেকে সমস্ত হল বুকিংয়ের জন্য একটি ‘অভিন্ন আবেদন পদ্ধতি’ চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা গোটা প্রক্রিয়াটিকে আরও সহজ ও স্বচ্ছ করবে। পাশাপাশি তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের বার্ষিক সাংস্কৃতিক কর্মসূচিগুলোকেও নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে রাজ্যের।
তবে বৈঠকের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি ছিল টলিপাড়ার অলিখিত নিয়ন্তা ‘ফেডারেশন’ এবং বিভিন্ন গিল্ডের বর্তমান ভূমিকা। কার্যবিবরণীতে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে বলা হয়েছে, ফেডারেশনের বর্তমান পরিচালন ব্যবস্থায় যদি দ্রুত পেশাদারিত্ব এবং স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে গোটা চলচ্চিত্র শিল্প এক বিপুল আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। যার সরাসরি কোপ গিয়ে পড়বে স্টুডিও পাড়ার সাধারণ টেকনিশিয়ান ও কলাকুশলীদের কর্মসংস্থানের ওপর।
নথিতে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, এই ফেডারেশন এবং গিল্ডগুলো আসলে ১৯২৬ সালের ট্রেড ইউনিয়ন আইন মেনে নথিভুক্ত। তাই গায়ের জোরে নয়, ভবিষ্যতের যেকোনও পরিবর্তন আসতে হবে সম্পূর্ণ আইনসম্মত উপায়ে এবং সরকারি নিয়ম মেনে। নতুন নির্বাহী কমিটি গঠিত হওয়ার আগে পর্যন্ত বর্তমান পরিকাঠামোই বহাল থাকবে। তবে এর আইনি অবস্থান স্পষ্ট করতে ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রারের কাছ থেকে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট তলব করা হয়েছে, যা পরবর্তীতে বিধায়কদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
স্টুডিও পাড়ার এই টালমাটাল পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে একটি শক্তিশালী ‘উপদেষ্টা কমিটি’ গঠনের রূপরেখা তৈরি করেছে নবান্ন। আর এই কমিটির তালিকায় রাখা হয়েছে টলিউডের সব হেভিওয়েট নামদের।
প্রস্তাবিত সদস্যবৃন্দর তালিকায় কারা রয়েছেন?
নথি অনুযায়ী, এই কমেটিতে রয়েছেন প্রস্তাবিত সদস্য়বৃন্দের তালিকায় রয়েছেন,
১. শ্রীমতী রূপা গাঙ্গুলি, মাননীয় বিধায়ক ২. শ্রীমতী পাপিয়া অধিকারী, মাননীয় বিধায়ক ৩. শ্রী রুদ্রনীল ঘোষ, মাননীয় বিধায়ক ৪. শ্রী হিরণ্ময় চট্টোপাধ্যায়, মাননীয় বিধায়ক ৫. শ্রী প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, অভিনেতা ৬. শ্রী দীপক অধিকারী (দেব), মাননীয় সাংসদ ৭. শ্রী যিশু সেনগুপ্ত, অভিনেতা ৮. শ্রী মহেন্দ্র সোনি, প্রযোজক ৯. শ্রী সানি ঘোষ রায়, পরিচালক ও প্রযোজক ১০. শ্রী জয়ন্ত কুণ্ডু, প্রবীণ প্রোডাকশন ম্যানেজার ১১. শ্রী কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, পরিচালক ১২. শ্রী সৃজিত মুখোপাধ্যায়, পরিচালক ১৩. শ্রী অমিত দাস, টিভি পরিচালক ১৪. শ্রী তন্ময় দে, অভিনেতা ১৫. ড. সৌমিত্র মোহন, আইএএস, সচিব, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর ১৬. শ্রী কৃত্তিবাস নায়ক, চলচ্চিত্র অধিকর্তা ১৭. শ্রীমতী শর্মিষ্ঠা বন্দ্যোপাধ্যায়, সিইও, নন্দন ১৮. শ্রী সান্তনু বসু, অতিরিক্ত সচিব, মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর ১৯. উপস্থিত বিধায়কদের সুপারিশ অনুযায়ী অন্যান্য সদস্যদেরও এই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, টলিপাড়ার অন্দরে গত কয়েক মাস ধরে যে চাপা ক্ষোভ ও অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা প্রশমিত করতে নবান্নের এই বৈঠক এবং এই সুপারিশগুলো আগামী দিনে ঢাল হিসেবে কাজ করবে। এখন দেখার, এই নতুন কমিটির হাত ধরে টলিউডের জট কতটা দ্রুত কাটে।
