
আজ থেকে পঁচিশ বছর আগের কথা। ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লিখতে চলেছিল ‘লগন’। ভুবন আর তার দলবলের ব্যাট-বল হাতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর গল্পে যখন গোটা দেশ মজেছিল। তবে পর্দার আড়ালে ঘটে গিয়েছিল এক অদ্ভুত কাণ্ড। ছবির শুটিংময়ের প্রথম সপ্তাহে খোদ ‘মিস্টার পারফেকশনিস্ট’ আমির খান বেশ ভয়েই পড়ে গিয়েছিলেন। মনে মনে ভাবছিলেন, কেরিয়ারের সবথেকে বড় ভুলটা বোধহয় করেই ফেললেন!
সম্প্রতি এক ফেস্টিভ্যালে সেই পুরনো দিনের স্মৃতি হাতড়ালেন আমির খান আর পরিচালক আশুতোষ গোয়ারিকর। গুজরাটে তখন ছবির শুটিং শুরু হয়েছে। প্রথম দিকের দৃশ্যগুলোর মধ্যে একটি ছিল সেই বিখ্যাত গান— ‘ঘনন ঘনন’এর শুটিং। আকাশে কালো মেঘ দেখে গ্রামবাসী যখন আনন্দে মেতে ওঠে, ঠিক সেই মুহূর্তের শ্যুট। শুটিংয়ের রিহার্সাল চলাকালীন আমির খান তাঁর অভ্যাসবশতই গিয়ে ফ্রেমের একেবারে মাঝখানে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি তখন বলিউডের মস্ত বড় স্টার, তাই কেন্দ্রে থাকাই তাঁর কাছে স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সেখানে বাদ সাধলেন পরিচালক আশুতোষ। সটান গিয়ে আমিরকে বললেন, “ভুবন, এখান থেকে সরে যাও।” আমির কিছুটা অবাক হয়ে সরে দাঁড়ান। কিন্তু আশুতোষ তাঁকে আরও দূরে, একেবারে ভিড়ের মধ্যে পাঠিয়ে দিলেন। আমিরের মনে তখন সাত-পাঁচ ভাবনা। তিনি ভাবছিলেন, এমনিতেই একটা ছকভাঙা ছবি বানাচ্ছি, তার ওপর ছবিতে আমি ছাড়া আর কোনও চেনা মুখ নেই। এমতাবস্থায় পরিচালক যদি ছবির একমাত্র স্টারকেই ফ্রেমের এক কোণে পাঠিয়ে দেয়, তবে দর্শক দেখবে কী?
ভয় পেয়ে আমির একসময় আশুতোষকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে সরাসরি তার চিন্তার কথা বলে ফেলেন। আমির বলেন, “দেখো, এমনিতে আমরা অনেক বড় ঝুঁকি নিচ্ছি। এই ছবিতে আমিই একমাত্র চেনা মুখ। আমাকেও যদি তুমি সাইড করে দাও, তবে তো আমাদের কপালে দুঃখ আছে!” আশুতোষ তখন শান্ত গলায় আমিরকে এক মোক্ষম যুক্তি শোনান। তিনি বলেন, গল্পের এই পর্যায়ে ভুবন তো আর পাঁচটা সাধারণ গ্রামবাসীর মতোই একজন। সে তখনও নেতা হয়ে ওঠেনি। তাই গ্রামপ্রধান বা ‘মুখিয়া’ ছাড়া ফ্রেমের মাঝখানে আর কারও থাকার কথা নয়। আশুতোষের সাফ কথা ছিল, “তুমি আমির খান বলে তোমাকে মাঝখানে রাখব না। ভুবন যখন ক্যাপ্টেন রাসেলের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে লড়াইয়ের দায়িত্ব নেবে, তখন গল্পের প্রয়োজনে ফ্রেম নিজেই তোমাকে মাঝখানে জায়গা করে দেবে।”
পরিচালকের এই দূরদর্শিতা দেখে কার্যত থ হয়ে গিয়েছিলেন আমির। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আশুতোষের মাথার ভেতর ছবির প্রতিটা দৃশ্য একদম কাঁচের মতো পরিষ্কার। তিনি কোনও কাজই অকারণে করছেন না। আমিরের আত্মবিশ্বাস এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গিয়েছিল। আমির জানালেন, এরপর থেকেই তিনি চোখ বন্ধ করে পরিচালকের ওপর ভরসা করতে শুরু করেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছিল, এই লোকটা ছবিটার নাড়ি নক্ষত্র জানে।
বাকিটা তো এখন ইতিহাস। অস্কারের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া এই ছবি আজও ভারতীয় সিনেমার গর্ব। এমনকি আদিত্য চোপড়া বা করণ জোহরের মতো ঘনিষ্ঠ বন্ধুরাও যখন আমিরের এই প্রোডাকশন নিয়ে সংশয়ে ছিলেন, আমির তখন লড়েছিলেন ভুবনের মতোই অদম্য জেদ নিয়ে। আর সেই জেদই আজ ‘লগন’-কে কালজয়ী করে রেখেছে।