Uttam Kumar: উত্তম কুমার কেন প্লেনে উঠতে ভয় পেতেন জানেন?
Uttam Kumar Unknown Stories প্রাথমিক দিকে দূরে কোথাও যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রেনের যাতায়াতই ছিল উত্তম কুমারের প্রথম পছন্দ। বিমানভীতির আসল শুরু হয়েছিল তাঁর কেরিয়ারের শুরুর দিকেই। একবার প্লেনে চড়ার সময় মাঝপপথে বিমানটি আচমকা বড় ধরনের ‘এয়ার পকেট’-এর কবলে পড়ে।

বাংলা সিনেমার ‘মহানায়ক’ উত্তম কুমারকে ঘিরে অনুরাগীদের কৌতূহলের অন্ত নেই। পর্দায় তাঁর রোমান্টিক চাউনি কিংবা অমায়িক হাসিতে কুপোকাত হতো গোটা দেশ। কিন্তু এত বড় মাপের একজন অভিনেতার মনেও যে লুকিয়ে ছিল বেশ কিছু অদ্ভুত ফোবিয়া বা ভয়, তা অনেকেই হয়তো জানেন না। জানা যায়, মহানায়ক প্রধানত তিনটি জিনিসকে চরম ভয় পেতেন— সাপ, ভূত এবং প্লেনে চড়া।
প্রাথমিক দিকে দূরে কোথাও যাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রেনের যাতায়াতই ছিল উত্তম কুমারের প্রথম পছন্দ। বিমানভীতির আসল শুরু হয়েছিল তাঁর কেরিয়ারের শুরুর দিকেই। একবার প্লেনে চড়ার সময় মাঝপপথে বিমানটি আচমকা বড় ধরনের ‘এয়ার পকেট’-এর কবলে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিমানটি খানিকটা নিচে নেমে যাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেই পরিস্থিতিতে যারপরনাই ভয় পেয়েছিলেন উত্তম কুমারও। সেই থেকেই তাঁর অবচেতন মনে বিমান নিয়ে একটা দীর্ঘমেয়াদী ভীতি বা ফোবিয়া তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
সময় বদলালো, সঙ্গে কাজের পরিধিও। আর সেই সঙ্গে সঙ্গে উত্তমের এই ভীতিও ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করে। মুম্বইয়ে হিন্দি ছবি প্রযোজনার সুবাদে তাঁকে প্রায়ই আকাশপথে যাতায়াত করতে হতো। এর পরে সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় কালজয়ী ‘নায়ক’ ছবির প্রদর্শনের জন্য তাঁর সঙ্গে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে জার্মানি যান উত্তম কুমার। উৎসব শেষ হওয়ার পর অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গে লন্ডন, প্যারিস ও সুইজারল্যান্ড ঘুরে তবেই দেশে ফেরেন। সেই প্রথম তাঁকে লম্বা আন্তর্জাতিক বিমান যাত্রার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়।
১৯৭৩-৭৪ সালের পর থেকে আমৃত্যু মুম্বইয়ের হিন্দি ছবিতে অভিনয়ের সূত্রে তাঁকে প্রতি মাসে পনেরো দিন অন্তর কলকাতা-মুম্বই যাতায়াত করতে হতো। নিয়মিত ফ্লাইটে যাতায়াত করতে করতে অবশ্য তাঁর সেই পুরোনো আতঙ্ক অনেকটাই কেটে গিয়েছিল। যদিও ভয় কিছুটা কাটলেও প্লেনে উঠলে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি সবসময় কাজ করত মহানায়কের মধ্যে। প্লেনে উঠলেই তিনি কেমন যেন চুপচাপ হয়ে যেতেন, কারও সঙ্গে কোনও কথা বলতেন না। সিটে চুপচাপ বসে একটি বইয়ে মুখ গুঁজে সময় কাটিয়ে দিতেন।
এমনই এক মজার ঘটনা ঘটেছিল ‘বন্দি’ ছবির শুটিং শেষে বেঙ্গালুরু থেকে মুম্বই ফেরার সময়। প্লেনে উত্তম কুমারের সঙ্গেই ছিলেন সহ-অভিনেতা আমজাদ খান। আমজাদের সিটটি ছিল জানালার ধারের আর তার পাশের আসনেই বসার কথা উত্তম কুমারের। প্লেন ছাড়ার আগে একটু ইতস্তত করে আমজাদ মহানায়ককে বলেন, “দাদা, যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা বলব?” উত্তমবাবু অভয় দিয়ে বলেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, নির্দ্বিধায় বলে ফেলো।” তখন আমজাদ লাজুক মুখে জানান যে প্লেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে তাঁর ভীষণ ভয় করে, তাই যদি জানালার ধারের সিটটায় তিনি বসেন।
এ কথা শুনে মনে মনে বেশ হাসলেও আমজাদের সামনে তা প্রকাশ করেননি উত্তম কুমার। উল্টে নিজের মনের মধ্যে থাকা বিমানভীতির কথা চেপে রেখে হাসিমুখে বলেছিলেন, “কোনও ব্যাপার না, তুমি বসো ওই সিটটায়!”
১৯৭৯ সালে আমেরিকা ও কানাডা সফরে যাওয়ার ঠিক কদিন আগেই প্লেন দুর্ঘটনার ওপর তৈরি বিখ্যাত হলিউড ছবি ‘এয়ারপোর্ট ১৯৭৮’ (Airport ’78) দেখেছিলেন উত্তম কুমার। ফলে দীর্ঘ বিমান যাত্রা নিয়ে তাঁর মনে বাড়তি একটা চিন্তা ও উৎকণ্ঠা কাজ করছিল।
অবশেষে যাত্রার দিন কলকাতা বিমানবন্দরের ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের অফিসে বসে চার পেগ স্কচ হুইস্কি পান করে তবেই ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের জাম্বো জেটে পা রেখেছিলেন মহানায়ক! উল্লেখ্য, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজই উত্তম কুমারের সেই আমেরিকা যাতায়াতের টিকিট স্পনসর করেছিল। শেষ পর্যন্ত অবশ্য কোনও ঝামেলা ছাড়াই সম্পূর্ণ সুস্থভাবে আমেরিকা ও কানাডা সফর সেরে দেশে ফিরেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এই চিরসবুজ বরপুত্র।
তথ্য সূত্র: আমার দাদা, তরুণ কুমার
