Explained: ৭ মে ভারতের শেয়ার বাজারে ৩ কোটি বার হামলার চেষ্টা পাকিস্তানের!

Pakistan Cyber Attack: শুধু ৭ মে একদিনেই পাকিস্তানের সাতটি APT বা Advanced Persistent Threat groups ভারত সরকারের বিভিন্ন দফতরে ১৫ লক্ষ বার সাইবার হামলার চেষ্টা চালায়। কাজে নামানো হয় পাকিস্তানের ইউটিউব চ্যানেলের কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, জনপ্রিয় পাক চ্যানেলের সঞ্চালকদেরও।

Explained: ৭ মে ভারতের শেয়ার বাজারে ৩ কোটি বার হামলার চেষ্টা পাকিস্তানের!

| Edited By: Purvi Ghosh

Jan 21, 2026 | 9:49 PM

অপারেশন সিঁদুর-এ ভারতীয় সেনা কীভাবে পাক জঙ্গি ও সেনার কোমর ভেঙে দিয়েছিল, এতদিনে সে কথা সকলেরই জানা। কিন্তু মিসাইল বা ড্রোন ছাড়াও ভারতের বুকে ইসলামাবাদ কতটা গভীর আঘাত হানার চেষ্টা করেছিল, এবার সেটাও প্রকাশ্যে চলে এল। অপারেশন সিঁদুর-এ এর একদম প্রথম দিনই, ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জে অন্তত ৩ কোটি বার হামলার চেষ্টা করে পাকিস্তান। কিন্তু প্রতিবারই তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পাকিস্তান চেয়েছিল ভারতের স্টক মার্কেটে সাইবার হামলা চালিয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতিতে আঘাত করতে। সংখ্যাটা ভাবুন! এক দু বার বা এক দু হাজারবার নয়! তিন কোটি বার হামলার চেষ্টা করে পাক হ্যাকাররা। একবারও সফল হলে দেশের শেয়ার বাজারে ধস নেমে যেত। টাকার বিচারে ক্ষতির পরিমাণ এখন আঁচ করাও সম্ভব নয়! কিন্তু ভারতীয় সেনা ও এথিকাল হ্যাকাররা সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করেন প্রতিবার।

সাধে কী আর বলে, এখন যুদ্ধ আর শুধু জলে-স্থলে বা আকাশে হয় না। চলে সাইবার দুনিয়াতেও। পোশাকি ভাষায় একে বলে ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার। AI ব্যবহার করে যে কারও ভিডিওকে দুমড়ে মুচড়ে এডিট করে, সম্পূর্ণ অন্য বার্তাবহ ভিডিওতে পরিণত করে দেওয়া এখন হ্যাক্যারদের কাছে জলভাত। আর সেটাই উদ্বেগের। কারণ, এই ধরণের ভিডিও টার্গেট করে সাধারণ, নিরীহ মানুষকে। ভারতীয় সেনার ন্যায়পরায়ণতাকে আঘাত করে এসব ভিডিও বানানো হয়। এবং সেটাও এতটাই নিখুঁত যে আসল-নকলের ফারাক বোঝা দায়। এসব ভিডিও এমন সুচারুভাবে প্রচার করা হয়, এতবার করে সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করা হয়, যে বারবার দেখতে দেখতে একজন সাধারণ মানুষ ভাবতে বাধ্য হন, এটা সত্যি নয়তো? ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ারের যুগে, সত্য-মিথ্যার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে– কার বক্তব্য শুনতে বেশি বিশ্বাসযোগ্য লাগছে। যারটা লাগছে, সেই জেতে।

এ প্রসঙ্গে ভারতীয় সেনার এডিজি, স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন, মেজর জেনারেল সন্দীপ শারদা জানিয়েছেন, ভারত ৭ মে অপারেশন সিঁদুর শুরু করতেই পাকিস্তানের খবর চ্যানেল, ইউটিউব চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা তেড়েফুঁড়ে ভারত বিরোধিতায় নেমে পড়ে। অপপ্রচার বা ‘প্রোপাগান্ডা’ শুরু করে দেয় ভারতের সেনার বিরুদ্ধে। শুধু ৭ মে একদিনেই পাকিস্তানের সাতটি APT বা Advanced Persistent Threat groups ভারত সরকারের বিভিন্ন দফতরে ১৫ লক্ষ বার সাইবার হামলার চেষ্টা চালায়। কাজে নামানো হয় পাকিস্তানের ইউটিউব চ্যানেলের কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, জনপ্রিয় পাক চ্যানেলের সঞ্চালকদের। এমনকী সেনা কর্তাদেরও। যাতে তাদের মিথ্যাগুলো শুনতে সত্যি বলে মনে হয়। প্রত্যেক পাক চ্যানেলের দফতরে জরুরি ভিত্তিতে এডিটোরিয়াল বৈঠক ডাকা হয়। সেই বৈঠকে প্রত্যেক পাক মিডিয়া হাউস নিজেদের মতো করে ভারত-বিরোধী পলিসি ঠিক করে নেয়। পুরোটা হয়েছে পাকিস্তানের ডিরেক্টর জেনারেল অফ দ্য ইন্টার সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশন বা DG ISPR, জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরীর নেতৃত্বে। একা DGISPR-ই নয়, তার আবার দোসর ISI বা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা। DG ISPR-এর মূল কাজ সেনার হয়ে প্রচার করা হলেও আসলে পাক সেনার এই দুই শাখাই পাকিস্তানের হয়ে মিথ্যাচার করতেই ব্যস্ত। কীভাবে ‘ন্যারেটিভ’ তৈরি করে ভারতকে অশান্ত করা যায় এই নিয়ে লাগাতর ছক কষে চলেছে দুই শাখা-ই।

৭ মে, DGISPR-ই ঠিক করে দেয় ভারতের প্রত্যাঘাতে পাক সেনার নাস্তানাবুদ হওয়ার কোনও ছবি-খবর পাক চ্যানেল দেখানো হবে না। পরিবর্তে, পাক চ্যানেলের দফতরে পাঠানো হয় ভারতের বিমান ধ্বংসের ফেক, ডক্টরড ও ডিপফেক ভিডিও। পাক সেনা সাংবাদিক বৈঠক করে সেই সব ভিডিও ফলাও করে জাহির করে। পাক প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা তাদের কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে সেই সব ভুয়ো তথ্য বিদেশি সংবাদমাধ্যমকে পাঠায়। মেজর জেনারেল সন্দীপ শারদা রীতিমতো পরিসংখ্যান পেশ করে দেখিয়েছেন, মাত্র ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যে পাকিস্তানের ইউটিউবাররা ভারত-বিরোধিতায় ১ লাখেরও বেশি বিশেষভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিডিও তৈরি করে ফেলে। ভারতে যে সব পাক চরেরা গা ঢাকা দিয়ে রয়েছে, তাদের মাধ্যমেও দ্রুত জাল ভিডিও প্রচার করা শুরু হয় ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ-এক্স মাধ্যমে। জ্যোতি মালহোত্রার মতো পাকিস্তানের হয়ে প্রচার করা ভ্লগারদের ময়দানে নামানো হয় মোটা টাকার বিনিময়ে। উদ্বেগের বিষয় হল, বিদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও পাক চরেরা গোপনে কর্মরত। তাদের মাধ্যমে কমপক্ষে ১৫টি বিদেশি চ্যানেলে পাক সেনার বানানো জাল ও ফেক ভিডিও প্রচার করতে শুরু করে ইসলামাবাদ। অপারেশন সিঁদুর-এ বিশেষ সুবিধা করে উঠতে না পারলেও পাকিস্তানের এই ফেক ভিডিও ছড়ানোর ট্র্যাডিশন আজও সমানে চলছে বলে জানিয়েছেন ভারতীয় সেনার স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশনের এডিজি। সেনার দেওয়া তথ্য বলছে, গত চার মাসে ভারতীয় সেনা ও সেনাকর্তাদের নিয়ে অন্তত ২১৭টি ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে ভাইরাল করেছে পাকিস্তান। যার মধ্যে ১৬৪টি সেনাবাহিনীকে নিয়ে, চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফকে নিয়ে ৯টি, চিফ অফ আর্মি স্টাফকে নিয়ে ২৩টি, বায়ুসেনা প্রধানকে নিয়ে ৪ ও নৌসেনা প্রধানকে নিয়ে ৩টি ডিপফেক ভিডিও ভাইরাল করার চেষ্টা করছে পাক সাইবার সেনা।

ভারতীয় সেনার আশঙ্কা, আজ সেনার কোনও শীর্ষ কর্তা, কোনও সাংবাদিক বৈঠক করলে তার আধঘণ্টার মধ্যে সেই ভিডিওর ডিপফেক তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা AI ব্যবহার করে সেই সব ভিডিও এতটাই নিখুঁত বানানো হচ্ছে যে উপর উপর দেখলে আসল-নকলের ফারাক বোঝা ভার। মানে, সেনাকর্তা বাস্তবে বলছেন এক, আর এডিট করে সেই ভিডিও বানানো হচ্ছে সম্পূর্ণ অন্যরকম। ভারতীয় সেনাকে ছোট দেখতে চেষ্টার কোনও কসুর রাখছে না পাকিস্তান। যেমন, সেনাপ্রধান উপেন্দ্র দ্বিবেদীর মুখ ব্যবহার করে ডিপফেক ভিডিও বানিয়ে দেখানো হয়, তিনি নাকি নিজের মুখে স্বীকার করছেন অপারেশন সিঁদুর-এ ভারতের ৬টি বিমান ও ২৫০ জন সেনার মৃত্যু হয়েছে। যা আদপেই মিথ্যা। শুধু বর্তমান সেনাপ্রধানকেই নয়, প্রাক্তন সেনা প্রধানদের নিয়েও এই একই কুৎসিত মিথ্যাচার করে চলেছে পাকিস্তান। অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্তা জেনারেল ভি পি মালিকের মুখে জাতিবিদ্বেষগত মন্তব্য ‘এডিট’ করে বসানো হয়। আরেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজীব ঘাইয়ের মুখে সেনার গেরুয়াকরণের কথা এডিট করে বসানো হয়। ভারত সরকারের PIB ফ্যাক্ট চেক ইউনিট ধরে ধরে এই সব ভিডিওর মিথ্যাচার ফাঁস করেছে ২০২৫-২৬-এর মধ্যে। সেনা সূত্রে খবর, অপারেশন সিঁদুর-এর পর থেকে সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী-ই পাক হ্যাকারদের মূল টার্গেট হয়ে উঠেছেন। সবচেয়ে বেশি ফেক ভিডিও তাঁকে নিয়েই তৈরি করে ছড়াচ্ছে পাকিস্তান।

এই ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার সম্পর্কে মানুষকে ওয়াকিবহাল করতে সদ্যই ভারতীয় সেনার ইস্টার্ন কমান্ড ‘শৌর্য কনক্লেভ’ নামে এক বিশেষ উদ্যোগ নেয় কলকাতায়। যেখানে সেনার শীর্ষ কর্তা, বিশেষজ্ঞরা হাতেকলমে দেখান কীভাবে দুষ্টচক্র ভারতের বিরুদ্ধে ফেক নিউজ ছড়াতে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে। কীভাবে সহজে ডিপফেক ভিডিও-কে চিহ্নিত করা যাবে, কীভাবে নকল ‘স্ক্রিনশট’ ধরা যাবে, কীভাবে বুঝতে হবে পুরনো ছবিকে ব্যবহার করে ‘ফেক নিউজ’ বানানো হচ্ছে কী না। পার্থপ্রতিম মুখোপাধ্যায়ের মতো ডিজিটাল ফরেনসিক ইনভেস্টিগেটর বুঝিয়ে দেন, কীভাবে নিজেদের ডিজিটাল ডিভাইসকে (যেমন মোবাইল বা ল্যাপটপ) সাইবার হামলার হাত থেকে বাঁচাতে হবে। যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রতিরক্ষা বিটের সাংবাদিকরা কীভাবে আসল ও নকল খবরের মধ্যে ফারাক বুঝতে পারবেন, তাও দেখানো হয় হাতেকলমে।