PM Narendra Modi: প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আমি বিষ্ণুর অবতার হিসেবে দেখি: শেরিং তোবগে
শেরিং তোবগে লিখেছেন, "আমি প্রায় ১৩ বছর ধরে গুজরাটে তাঁর শাসন ব্যবস্থা দেখেছি, কীভাবে সেই রাজ্যটি বৃদ্ধি, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের একটি জাতীয় মডেলে পরিণত হয়েছিল। এরপর আমি তাঁকে সেই একই স্বপ্ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমগ্র দেশের স্তরে উন্নীত করতে দেখেছি।"

প্রশাসনিক পদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে অভিনন্দন জানালেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে। মোদীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। মোদীর জন্য কলম ধরলেন শেরিং তোবগে।
———————————————————————————————–
২০১৯ সালের ২৭ জুলাই আমি দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি।
তার ১০ মাস আগে ভুটানের নির্বাচনে আমার দল পরাজিত হয়েছিল এবং সংসদে আমাদের আর কোনও প্রতিনিধি ছিল না। আমি প্রধানমন্ত্রী বা সাংসদ কোনোটাই ছিলাম না। কেবল একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেই আমি প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম।
আমার মেয়াদকালে তিনি যে সমর্থন জুগিয়েছিলেন, তার জন্য আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। তাঁকে বলি, তিনি সর্বদা আমার বড় ভাইয়ের মতোই থাকবেন। শুধু বয়সে বড় হওয়ার জন্য নয় বরং একজন বড় ভাই ছোট ভাইয়ের প্রতি যে স্নেহ-ভালোবাসা রাখেন, তিনি আমার সঙ্গে তেমনই আচরণ করেছিলেন।
এরপর আমি তাঁকে আর একটি কথা বলি। আমি তাঁকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে দেখি। আমাদের অঞ্চলের সংস্কৃতিতে, আলোকিত বা প্রজ্ঞাবান শাসকদের চিরকাল সেভাবেই দেখা হয়ে এসেছে।
নিজের কথা শুনে আমি নিজেই অবাক হয়েছিলাম। পরে ভেবেছিলাম, কী ভেবে আমি কথাটা বললাম? আমি কি আবেগে ভেসে গিয়েছিলাম? আমি কি ভুল ছিলাম?
পরবর্তীকালে নিজের বলা কথাগুলো নিয়ে যখন চিন্তাভাবনা করলাম, উত্তরটা স্পষ্ট হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী মোদীকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে দেখাটা আমার একেবারেই ভুল ছিল না।
আমি প্রায় ১৩ বছর ধরে গুজরাটে তাঁর শাসন ব্যবস্থা দেখেছি, কীভাবে সেই রাজ্যটি বৃদ্ধি, অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের একটি জাতীয় মডেলে পরিণত হয়েছিল। এরপর আমি তাঁকে সেই একই স্বপ্ন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমগ্র দেশের স্তরে উন্নীত করতে দেখেছি। উৎপাদন খাত, বৈদেশিক বিনিয়োগ, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, পরিচ্ছন্নতা, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো-সবকিছুর মূলেই ছিল সেবা ও বাস্তবায়নের প্রতি তাঁর নিরবচ্ছিন্ন জোর।
আমি সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ব্যক্তি মোদীকেও দেখেছি: সুশৃঙ্খল, শক্তিমান এবং অসাধারণ পরিশ্রমী। যা আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল, তা হল নিজের দেশ ও দেশের মানুষের সেবা করার প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা।
তবে তার চেয়েও বড় কথা, তিনি ভারতীয়দের মনে নিজেদের প্রতি এবং নিজেদের দেশের প্রতি এক শক্তিশালী বিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছেন। তাঁরা ভারতকে নিয়ে আরও গর্বিত, সম্ভাবনা নিয়ে আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং বিশ্বে ভারতের অবস্থান নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। আমার কাছে এগুলোই একজন প্রকৃত শাসকের গুণ বলে বিবেচ্য।
ভুটানের বৌদ্ধ ঐতিহ্যে আমরা ‘রিগসুম গোনপো’-কে ভক্তি করি, যিনি সকল জীবের মুক্তির জন্য নিবেদিত বোধিস্তত্ত্বের এক ত্রিমূর্তি। মৈত্রেয় বা মঞ্জুশ্রী প্রজ্ঞার প্রতীক। অবলোকিতেশ্বর করুণার প্রতীক এবং বজ্রপাণি সাহসের প্রতীক।
আমার মতে, আলোকিত নেতৃত্ব হল আত্মত্যাগ ও নিঃস্বার্থ সেবার মাধ্যমে এই তিনটি গুণের প্রকাশ পায়- প্রজ্ঞা, করুণা ও সাহস।
আজ আমি প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘বিকশিত ভারত’-এর দর্শনে এই গুণগুলোর চূড়ান্ত প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি।
প্রজ্ঞার সূচনা হয় একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্পষ্ট রূপরেখা বা ভিশন থেকে। আর তিনি ভারতকে সেটি দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঠিক এক শতাব্দী পর, ২০৪৭ সালের মধ্যে একটি উন্নত জাতিতে পরিণত হওয়া। বিকশিত ভারতের মাধ্যমে তিনি সেই স্বপ্নকে একটি নাম, একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা এবং একটি জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছেন।
অন্যদের আশা ও আকাঙ্ক্ষাকে অনুধাবন করার মধ্যে দিয়েই করুণার জন্ম হয়। আর বিকশিত ভারত ঠিক সেই বিষয়টিরই প্রতিফলন ঘটায়। এক শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশের জন্য ১৪০ কোটি ভারতীয়ের যৌথ আকাঙ্ক্ষা। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ ধারণাটি সেই আকাঙ্ক্ষার কথাই বলে।
স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দৃঢ়সংকল্প থেকেই সাহস তৈরি হয়। মানবসম্পদ গড়ে তোলা, বিনিয়োগ আনা, অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং সর্বোপরি শাসনব্যবস্থার উন্নয়ন করার জন্য প্রয়োজন কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ও তার বাস্তবায়ন করা। দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা সহজ, কিন্তু রূপান্তর সহজ নয়। নিঃস্বার্থ সেবা এই গুণগুলোকে একসঙ্গে বেঁধে রাখে। বিকশিত ভারত কেবল কোনও একজন নেতা বা একটি নির্বাচনের বিষয় নয়। এটি বর্তমান এবং আগামী প্রজন্মের বিষয়। আর ‘সবকা প্রয়াস’-এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রতিটি ভারতীয়কে কেবল এই মিশনকে সমর্থন করতেই আহ্বান জানাননি, বরং এটি তৈরিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
নিঃসন্দেহে এটি তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। তিনি কেবল ভারতকে একটি গন্তব্যই দেননি, তিনি ভারতীয়দের সেই স্বপ্নে বিশ্বাস করতে এবং তা অর্জনে কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছেন।
বিকশিত ভারতের গুরুত্ব ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত। প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক নীতিতে সর্বদা ভারতের প্রতিবেশীদের অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর স্বার্থরক্ষায় নেতৃত্ব দিয়েছেন, ‘ভয়েস অব গ্লোবাল সাউথ’ শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন এবং আফ্রিকান ইউনিয়নকে জি২০-র স্থায়ী সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সফল প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছেন।
ভারত যত শক্তিশালী হবে, তত বেশি অবদান রাখতে পারবে। একটি উন্নত ভারত বিশ্ববাজারে বড় সুবিধা প্রদান করবে, শেয়ার করার মতো বিপুল মূলধন ও প্রযুক্তি অর্জন করবে এবং বিশ্বমঞ্চের এজেন্ডা গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে, যা এই অঞ্চল ও গ্লোবাল সাউথের স্বার্থকে তুলে ধরবে। তবে আমার জন্য এটি আরও অনেক বেশি ব্যক্তিগত।
বিকশিত ভারত মানেই বিকশিত ভুটান। ২০১৪ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য ভুটানকে বেছে নেন। আমি তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলাম এবং তাঁকে অভ্যর্থনা জানানোর সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেই সফরকালে তিনি তিনটি শব্দের মাধ্যমে আমাদের সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন।
শব্দগুলো সহজ হলেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। বছরের পর বছর ধরে তিনি এটি বাস্তবে করে দেখিয়েছেন। সেই কারণেই আমাদের একাদশ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ভারতের সহায়তা আমার প্রথম সরকারকে একটি উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে সাহায্য করেছিল।
সেই কারণেই প্রধানমন্ত্রী মোদী আমাদের দ্বাদশ পরিকল্পনার মাধ্যমেও সেই উদার অংশীদারিত্ব বজায় রেখেছিলেন। সেই কারণেই, ২০২৪ সালে যখন আমি আবারও দায়িত্বে ফিরে আসি, তিনি আমাদের ১৩তম পরিকল্পনার জন্য ভারতের সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়ে ১০,০০০ কোটি টাকা করেছেন।
আজ B4B পুরো ভুটান জুড়ে দৃশ্যমান। বিদ্যালয় ও হাসপাতালে, রাস্তা ও সেতুতে, জলবিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিতে, কৃষিতে এবং শিল্প উদ্যোগে সব ক্ষেত্রে। তবে মহামান্য রাজার ‘গেলেফু মাইন্ডফুলনেস সিটি’ (Gelephu Mindfulness City) ভিশনে ভারতের সমর্থনের চেয়ে B4B-র বড় প্রভাব আর কোথাও নেই।
প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতের পূর্ণ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এবং সেই প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যে রেলপথ, সীমান্ত অবকাঠামো এবং বিমান ও ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে রূপ নিতে শুরু করেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারতীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধানমন্ত্রী মোদীর স্পষ্ট সমর্থন থেকে ইঙ্গিত পেয়েছে। টাটা পাওয়ার, আদানি গ্রুপ, জেএসডব্লিউ এনার্জি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ভুটানের অর্থনৈতিক রূপান্তরে বিনিয়োগ করছে, অন্যদিকে শীর্ষস্থানীয় ভারতীয় ব্যবসায়ী ব্যক্তিবর্গ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে GMC-তে যোগ দিয়েছেন।
তাই ভুটানের মহামান্য রাজা যখন প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আমাদের সর্বোচ্চ সম্মান ‘অর্ডার অব দ্য ড্রুক গ্যালপো’-তে ভূষিত করেন, তখন সমস্ত ভুটানবাসী আনন্দিত হয়েছিল। ভুটানের প্রতি তাঁর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মান দেওয়া হয়। তিনি প্রথম এবং একমাত্র বিদেশি নেতা যিনি এই সম্মান পেলেন।
আমার জন্য তাঁর প্রভাব আরও বেশি ব্যক্তিগত। আমি দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে বড় ভাই হিসেবে দেখে এসেছি এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে একজন অভিভাবক বা মেন্টর হিসেবে দেখতে শুরু করেছি। তাঁকে কখনও আমাকে নির্দেশ দিতে হয়নি। একজন জনসেবক হিসেবে তাঁর উদাহরণই আমার জন্য যথেষ্ট শিক্ষা ছিল।
আজ, যখন সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মোদী ২৫ বছর পূর্ণ করছেন, আমার ২০১৯ সালের সেই আকস্মিক কথোপকথনের কথা মনে পড়ছে। ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ আমাদের পরবর্তী সাক্ষাতের কথাও মনে পড়ছে। ততদিনে আমি আবারও প্রধানমন্ত্রী হয়েছি। আমি তাঁকে বিষ্ণুর অবতার দেখার কথা বলার পাঁচ বছর পর, দিল্লিতে আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি।
আমি তাঁকে বলি, পাঁচ বছর আগে যা বলেছিলাম তা নিয়ে আমি দীর্ঘ সময় ধরে অনেক ভেবেছি এবং ভাবছিলাম আমি ভুল ছিলাম কি না। আমি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে আমি ঠিক ছিলাম। শুধু তা-ই নয়। এখন আমি জানি তিনি ঠিক কোন অবতার। বিষ্ণুর শেষ অবতার, যিনি বিশৃঙ্খলা দূর করা, ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং নবযুগের সূচনার সঙ্গে যুক্ত।
