
এক সময় ধারণা ছিল- বড় ব্যবসা গড়ে তুলতে হলে মেট্রো শহরই একমাত্র ভরসা। কিন্তু আজকের আধুনিক ভারত সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। জয়পুর, ইন্দোর, শিলিগুড়ি, রাঁচি, আগরতলা, গয়া, তিরুপতি কিংবা বালাসোর- এমন অসংখ্য ছোট শহর ও নন-মেট্রো অঞ্চল থেকে উঠে আসছেন তরুণ উদ্যোক্তপতিরা, যারা সীমিত সম্পদ, নেটওয়ার্ক এবং সামাজিক চাপকে অতিক্রম করে গড়ে তুলছেন সফল স্টার্টআপ।
নন-মেট্রো শহরের উদ্যোক্তপতিদের চ্যালেঞ্জ কম নয়। তাদের পুঁজি জোগাড় করা কঠিন, দক্ষ মেন্টর বা ইনভেস্টর সহজে পাওয়া যায় না, প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোও অনেক সময় দুর্বল হয়। তবু এই সীমাবদ্ধতাই তাদের শক্তি হয়ে উঠেছে।
ইন্টারনেটের বিস্তার, স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং ইউপিআই-এর মতো ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ছোট শহরের উদ্যোক্তাদের জন্য দরজা খুলে দিয়েছে। অনলাইন মার্কেটপ্লেস, সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং এবং রিমোট টিম—সব মিলিয়ে আজ ব্যবসা শুরু করতে শহরের সীমা আর বড় বাধা নয়। ইউটিউব, অনলাইন কোর্স ও স্টার্টআপ কমিউনিটির মাধ্যমে তারা শিখছে, পরীক্ষা করছে, দ্রুত ব্যবসা বৃদ্ধি করছে।
স্টার্টআপের শুরুতে অনেকেই পরিবার ও সমাজের প্রশ্নের মুখে পড়ে যে নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে ব্যবসা? কিন্তু সাফল্যের ছোট ছোট ধাপ—প্রথম গ্রাহক, প্রথম লাভ বা রেভিনিউ, প্রথম বিনিয়োগ- এই সবকিছু বদলে দিয়েছে দৃষ্টিভঙ্গি। আজ অনেক পরিবারই সন্তানদের উদ্যোগপতি বা স্টার্টআপ শুরু করতে উৎসাহ দিচ্ছে।
এছাড়া স্টার্টআপ ইন্ডিয়া, মুদ্রা লোন, স্ট্যান্ড-আপ ইন্ডিয়া, ইনকিউবেশন সেন্টার ও রাজ্যভিত্তিক স্টার্টআপ নীতি—কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগগুলি নন-মেট্রো শহরের উদ্যোক্তাদের সাহস জুগিয়েছে। টায়ার-২ ও টায়ার-৩ শহরে কো-ওয়ার্কিং স্পেস ও ইনোভেশন হাব গড়ে ওঠায় ইকোসিস্টেম শক্তিশালী হচ্ছে।
ভারতের স্টার্টআপ মানেই যে শুধু বেঙ্গালুরু, দিল্লি বা মুম্বই- এই ধারণা বহু আগেই ভেঙে গেছে। আজ দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম ও ছোট শহর থেকেও উঠে আসছেন এমন উদ্যোক্তারা, যাঁরা সীমিত সম্পদ, সামাজিক বাধা ও পরিকাঠামোগত দুর্বলতাকে জয় করে গড়ে তুলেছেন বহু কোটি টাকার সংস্থা। তাঁদের সাফল্য প্রমাণ করে—আইডিয়া আর অধ্যবসায় থাকলে জায়গা কোনও বাধা নয়।
কেরলের ওয়ানাড জেলার একটি ছোট গ্রামের বাসিন্দা পি.সি. মুস্তাফা। তিনি তৈরি করেছেন আইডি ফ্রেশ ফুড (iD Fresh Food)। একসময় যিনি ছিলেন দিনমজুরের ছেলে, তিনিই ২০১৫ সালের মধ্যেই গড়ে তুলেছেন ১০০ কোটি টাকার সংস্থা। মাত্র ২৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে খুড়তুতো ভাই-বোনদের সঙ্গে শুরু করা ইডলি-ধোসা ব্যাটারের ব্যবসা আজ দেশের বহু শহর ছাড়িয়ে দুবাই পর্যন্ত পৌঁছেছে। গুণমান ও স্কেলেবিলিটিকে অগ্রাধিকারই তাঁর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে জন্ম নেওয়া কৌশল দুগার তৈরি করেছেন টি-বক্স (Teabox) সংস্থা। চা শিল্পের শতাব্দীপ্রাচীন সাপ্লাই চেইনকে নিয়ে নতুনভাবে ভাবনাচিন্তা করেন তিনি। দার্জিলিংয়ের বাগান থেকে সরাসরি বিশ্বজুড়ে গ্রাহকের হাতে প্রিমিয়াম চা পৌঁছে দেওয়ার এই মডেল আজ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করেছে। স্থানীয় শিকড়ের সঙ্গে বিশ্ববাজারের সংযোগই টি-বক্স (Teabox)-এর শক্তি।
তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুরে ফিরে এসে অণুগ্রহা ও দিনেশ শুরু করেন ইয়ালি অ্যারোস্পেস (Yali Aerospace)। ছোট শহরে থেকেও যে অ্যারোস্পেস ও ড্রোন প্রযুক্তির মতো হাই-টেক ম্যানুফ্যাকচারিং সম্ভব, তা প্রমাণ করেছে এই ইঞ্জিনিয়ার দম্পতি। তাঁদের উদ্যোগ প্রশংসা পেয়েছে জোহো (Zoho)-র সিইও শ্রীধর ভেম্বুর কাছ থেকেও।
নিজেদের শহরের প্লাস্টিক দূষণে উদ্বিগ্ন হয়ে ঋষভ পটেল ও নীতিন যাদব শুরু করেন ‘ডাম্প ইন বিন’। প্লাস্টিক বর্জ্যকে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রীতে রূপান্তর করা এই উদ্যোগ ইতিমধ্যে ৭০০ টনের বেশি বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করেছেন তারা। ইউএনডিপি-র Youth Co:Lab প্রোগ্রামের সমর্থনে এই স্টার্টআপ প্রান্তিক নারীদেরর জন্য কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে।
কেরলের আরীকোডে থেকে রামিস আলি সহ-প্রতিষ্ঠা করেন ইন্টারভাল লার্নিং (Interval Learning)। আজ এই ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ১৫০টিরও বেশি শহরে ৪০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছেছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক- ১০ হাজারের বেশি শিক্ষকের মধ্যে ৯৯ শতাংশই নারী, যাঁদের বড় অংশ টিয়ার-৩ ও টিয়ার-৪ গ্রামের বাসিন্দা।
বিহারের পটনার রোহিত কাশ্যপ মাত্র ১৪ বছর বয়সে শুরু করেন তাঁর স্টার্টআপ যাত্রা। সীমিত সম্পদের মধ্যেও গড়ে তোলেন ফুড-টেক স্টার্টআপ ফুডকিউবো (Foodcubo) এবং পরে তিনি শুরু করেন Maytree School of Entrepreneurship—যার লক্ষ্য তাঁর মতো উদ্যোগপতি তরুণদের পথ দেখানো।
উত্তর প্রদেশের আজমগড়ের একটি ছোট গ্রাম থেকে উঠে আসা অতুল রাই প্রতিষ্ঠা করেন এআই স্টার্টআপ স্ট্যাকু (Staqu)। ইমেজ আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে বিশেষজ্ঞ এই সংস্থা আজ পেটিএম ও প্যানাসনিকের মতো বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছে। কঠোর পরিশ্রম আর ফোকাসই তাঁর সাফল্যের মন্ত্র।
সত্যনারায়ণ নন্দলাল নুয়াল- রাজস্থানের একটি ছোট শহর থেকে উঠে এসে নাগপুরে গড়ে তোলেন সোলার ইন্ডাস্ট্রিজ (Solar Industries)। স্কুলছুট এই উদ্যোক্তা আজ বহু-কোটি টাকার পাবলিক কোম্পানির মালিক, যা বিস্ফোরক ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করে। তাঁর জীবনগাথা অধ্যবসায়ের এক অনন্য উদাহরণ।