India is ageing: ক্রমেই বাড়ছে প্রবীণ জনসংখ্যা, দেখভালের জন্য কতটা প্রস্তুত ভারত?
India: এছাড়া প্রবীণদের জন্য চিকিৎসা পরিষেবা বা জেরিয়াট্রিক কেয়ার, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং সহজে চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেই হবে না, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দিতে হবে।

রাজ্যের নাম বিহার। সেখানে একটি ছোট শহরে সত্তরোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা একটি খাটে বসে আছেন। তাঁর সন্তানরা বেঙ্গালুরু ও দুবাইতে থাকেন। তিনি নিজের খাবার, নিজের ওষুধ নিজেই কেনেন। সবটাই তাঁর একা-একা করেন। এই বৃদ্ধা একা নন, তাঁর মতো এই গল্প এ দেশের আরও ঘরে-ঘরে রয়েছে। আর সময় এসেছে এই বিষয়টি নিয়ে ভাবার। কারণ, দেশে ক্রমেই বাড়ছে প্রবীণ জনসংখ্যা। আর তাঁদের দেখভালের জন্য কতটা প্রস্তুত ভারত? ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশেরও বেশি হতে পারে ষাটোর্ধ্ব নাগরিক।এই পরিস্থিতিতে প্রবীণদের নিরাপত্তা ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে কতটা প্রস্তুত ভারত?
ভারত এখনও যুব প্রজন্মের দেশ বলে মনে করে নিজেকে। বহু দশক ধরে তা সত্যিই ছিলও। কর্মসংস্থান থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সব ক্ষেত্রেই গুরুত্ব পেয়েছে দেশের তরুণ জনসংখ্যা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে সেই ছবি। ক্রমশ বাড়ছে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা। আর এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাঁদের আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং দেখভালের ব্যবস্থা কতটা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
২০৫০ সালের মধ্যে বড় পরিবর্তন জনসংখ্যার কাঠামোয়
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশই হবেন প্রবীণ নাগরিক। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ২০৪৬ সালের মধ্যে ভারতে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের তুলনায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বেশি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এটি আশঙ্কার কোনও বিষয় নয়। আজ যাঁদের বয়স ৪০ বছর, তাঁরাও ২০৪৬ সালের মধ্যে প্রবীণ হবেন। ফলে তরুণ কর্মশক্তির উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা ভারতের অর্থনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থাকে আগামী দিনে প্রবীণদের চাহিদার কথা মাথায় রেখেও পরিকল্পনা করতে হবে।
আর্থিক নিরাপত্তার অভাব বড় চিন্তার
প্রবীণ জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে তাঁদের আর্থিক সুরক্ষা। বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতের ৪০ শতাংশেরও বেশি প্রবীণ নাগরিক দেশের সবচেয়ে দরিদ্র আর্থিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে, প্রায় ১৮.৭ শতাংশ প্রবীণ মানুষের কোনও নির্দিষ্ট আয়ের উৎস নেই। তাঁদের কাছে নেই পেনশন, পর্যাপ্ত সঞ্চয় কিংবা পরিবারের কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা পাওয়ার নিশ্চয়তা। ফলে অনেকের কাছেই বার্ধক্য শুধু শারীরিক পরিবর্তনের পর্যায় নয়, আর্থিক অনিশ্চয়তারও সময়। চিকিৎসার খরচ, দৈনন্দিন জীবনযাপনের ব্যয় এবং অন্যের উপর নির্ভরশীলতা তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
বদলে যাচ্ছে পরিবারের চেনা ছবি
একসময় বৃদ্ধ নাগরিকদের দেখভালের দায়িত্ব নিতেন বাড়ির সদস্যরাই। যৌথ পরিবারে একাধিক প্রজন্ম একসঙ্গে থাকত। ফলে বয়স্ক বাবা-মায়ের পাশে সন্তান বা পরিবারের অন্য সদস্যদের পাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল।
কিন্তু বর্তমানে সেই চেনা পারিবারিক কাঠামো বদলাচ্ছে। ছোট হচ্ছে পরিবার, কাজের সন্ধানে সন্তানরা পাড়ি দিচ্ছেন অন্য শহরে কিংবা বিদেশে। ফলে অনেক বয়স্ক মানুষকেই একা থাকতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে জীবনযাত্রার খরচ। নিজেদের সংসার চালানোর পাশাপাশি দূরে থাকা বাবা-মায়ের খরচ বহন করাও অনেক পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠছে।
পেনশন ও স্বাস্থ্য পরিষেবায় আরও নজর প্রয়োজন
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের একাধিক দেশ প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা দেয়। পেনশন, স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন পরিষেবা তাঁরা পেয়ে থাকেন। কিন্তু ভারতের সামনে আলাদা চ্যালেঞ্জ। দেশের বিপুল জনসংখ্যার জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান গড়ে তোলার পাশাপাশি, আর্থিক উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব তারও চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
বিশেষ করে বেসরকারি ক্ষেত্রে কর্মরত মানুষজন যাতে পেনশনের মতো সুবিধা পান, সেই দিকেও নজর রাখতে হচ্ছে। কারণ কর্মজীবনের বড় অংশে বহু মানুষের নিয়মিত পেনশন বা অবসরকালীন সুবিধা থাকে না, ফলে বার্ধক্যে এসে তাঁদের আর্থিক সমস্যায় পড়তে হয়।
এছাড়া প্রবীণদের জন্য চিকিৎসা পরিষেবা বা জেরিয়াট্রিক কেয়ার, দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যা এবং সহজে চিকিৎসা পাওয়ার ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেই হবে না, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দিতে হবে।
সাধারণত অবসরের পরিকল্পনা বলতে বোঝানো হয় ব্যক্তিগত সঞ্চয়, ফিক্সড ডিপোজিট, মিউচুয়াল ফান্ড কিংবা পেনশন প্রকল্পে বিনিয়োগ। কিন্তু বার্ধক্যে একজন মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি কোথায় থাকবেন, অসুস্থ হলে কে পাশে থাকবেন এবং দৈনন্দিন কাজে কতটা সাহায্য পাবেন—এই প্রশ্নগুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তাই অবসরের পরিকল্পনাকে শুধু ব্যক্তিগত আর্থিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে চলবে না। পরিবারের সকলের সঙ্গে আলোচনা করে ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ঠিক করা জরুরি। বিশেষত যাঁদের বাবা-মা ইতিমধ্যেই ষাটোর্ধ্ব, তাঁদের নিয়মিত আয়, চিকিৎসার সুযোগ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সাহায্য পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
প্রবীণদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, পেনশনের আওতা বৃদ্ধি, উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং পরিচর্যার পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজ ভবিষ্যতের জন্য ফেলে রাখা যায় না। ২০৪৬ সালের জনসংখ্যার চিত্র স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা না করে এখনই পদক্ষেপ করা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে ভারত তার তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার উপর গুরুত্ব দিয়েছে। এবার সমান গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে প্রবীণদের ভবিষ্যৎ নিয়েও।
