
তিরুবনন্তপুরম: স্বামী সম্পত্তি বিক্রি করে দিলেও, সেই সম্পত্তি বিক্রির টাকা থেকে ভরণপোষণের জন্য খোরপোশ পাওয়ার অধিকার রয়েছে স্ত্রীয়ের। একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলায় এমনটাই রায় দিল কেরল হাইকোর্টের ফুল বেঞ্চ। আদালতের তরফে বলা হয়, হিন্দু দম্পতির ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদের সময় যদি ভরণপোষণের মামলা দায়েরের পর সম্পত্তি বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয় কিংবা সম্পত্তির ক্রেতা যদি আগে থেকেই বিক্রেতার স্ত্রীর দাবির কথা জানেন, সেক্ষেত্রে বিক্রি করা সম্পত্তির টাকা থেকেও ভরণপোষণের খরচ চাইতে পারেন স্ত্রী।
বিচারপতি সুশ্রুত অরবিন্দ ধর্মাধিকারী, বিচারপতি পি.ভি. কুণহিকৃষ্ণন ও বিচারপতি জি. গিরিশ-এর বেঞ্চের তরফে জানানো হয় যে এ ধরনের মামলার ক্ষেত্রে স্ত্রীর ভরণপোষণের অধিকার ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টের ৩৯ ধারা এবং হিন্দু মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডপশন অ্যাক্ট (HAMA)-এর ২৮ ধারার সুরক্ষা পাবে। এই ধারাগুলি অনুযায়ী, কোনও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তরিত হলেও তৃতীয় পক্ষের ভরণপোষণের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
এই আইন অনুযায়ী, বিয়ের সময় থেকেই স্ত্রীর ভরণপোষণের অধিকার সুপ্তভাবে জন্ম নেয়। ভরণপোষণের মামলা দায়ের হলে তা অপরিণত বা ইনকোয়েট (Inchoate) অধিকার হয়ে ওঠে এবং আদালত ভরণপোষণের আদেশ দিলে তা সম্পত্তির ওপর চার্জ (Charge) হিসেবে কার্যকর হয়। আদালতের মতে, ভরণপোষণের দাবির জন্য আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর যদি স্বামী তাঁর সম্পত্তি বিক্রি করেন, তাহলে সেই বিক্রির অর্থও স্ত্রীর ভরণপোষণের অধিকারের অধীনেই গণ্য হবে।
মামলার পটভূমি-
ডিভিশন বেঞ্চের করা দুটি প্রশ্নের উত্তরেই কেরল হাইকোর্ট এই রায় দেয়। এক মহিলা পারিবারিক আদালতে তাঁর স্বামীর বিরুদ্ধে খোরপোশের মামলা করেছিলেন। ম্যাট্রিমোনিয়াল আপিলে এক ব্যক্তি জানান, তিনি ওই মহিলার স্বামীর কাছ থেকে সম্পত্তি কিনেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে পারিবারিক আদালত ওই মহিলাকে দিয়ে দেয়।
ফ্যামিলি কোর্ট ওই ব্যক্তির দাবি খারিজ করে জানায়, ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টের ৩৯ ধারা অনুযায়ী স্ত্রীর ওই সম্পত্তির ওপর ভরণপোষণের অধিকার রয়েছে। ফ্যামিলি কোর্ট এই ক্ষেত্রে রমনকুটটি পুরুষোত্তম বনাম আম্মিনিকুট্টি (১৯৯৭) মামলার রায়ের উদাহরণ দেয়।
ওই ক্রেতা ডিভিশন বেঞ্চে আপিল করেন এবং দাবি করেন যে, HAMA আইনে স্ত্রীর ভরণপোষণের জন্য স্বামীর সম্পত্তির লাভ থেকে টাকা পাওয়ার কোনও স্পষ্ট বিধান নেই, ফলে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টের ৩৯ ধারা এখানে প্রযোজ্য নয়।
ফুল বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ-
ডিভিশন বেঞ্চ বিভিন্ন রায়ে পরস্পরবিরোধী মত লক্ষ্য করে বিষয়টি ফুল বেঞ্চে পাঠায়। ফুল বেঞ্চ ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টের ৩৯ ধারা এবং হিন্দু মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডপশন অ্যাক্ট (HAMA)-এর ৪, ১৮, ২১, ২৩, ২৭ ও ২৮ ধারা খতিয়ে দেখে জানায় যে ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টের ৩৯ ধারা সরাসরি সম্পত্তির ওপর অধিকার সৃষ্টি না করলেও, ভরণপোষণের অধিকার থাকলে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও সেই অধিকার সুরক্ষা পায়। HAMA আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, আইনের কোডিফিকেশনের পর প্রাচীন ধর্মীয় বিধানগুলির অসঙ্গত অংশ কার্যকর নয়। আদালত আরও জানায়, HAMA-এর ২৭ ধারাই একমাত্র ধারা যেখানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সম্পত্তির ওপর অধিকার সৃষ্টি হতে পারে—যেমন উইল, আদালতের ডিক্রি বা চুক্তির মাধ্যমে।
হাইকোর্টের রায়ে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে ভরণপোষণের মামলা চলাকালীন সম্পত্তি বিক্রি করে স্বামী স্ত্রীর ভরণপোষণের দায় এড়াতে পারেন না। স্ত্রী তারঁ ভরণপোষণের দাবি সম্পত্তির লাভ থেকেও আদায় করতে পারবেন।