‘হাউস ওয়াইফ’ হতে পারলে, ‘হাউস হাজব্যান্ড’ নয় কেন? বড় পর্যবেক্ষণ আদালতের
Madras High Court Case : আদালত উল্লেখ করেছে, গৃহস্থালির কাজের একটি বিশেষ মূল্য রয়েছে বলে আগেই স্বীকৃতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। মাদ্রাজ হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, "ভারতীয় সমাজের ইতিহাস বলছে, পরিবারকে কেন্দ্র করেই বিবাহের ধারণা গড়ে উঠেছে। সেখানে স্বামীকে পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব পালন করা এবং স্ত্রীকে সংসার সামলানোর ভূমিকায় দেখা হত। তবে আদালতের মতে, দু’টি ভূমিকাই সম্মানের।

চেন্নাই: ‘হাউস ওয়াইফ’ যদি হতে পারে, তাহলে হাউস হাজব্যান্ড নয় কেন?’ এমনই প্রশ্ন তুলে সাম্প্রতিক একটি মামলায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করেছে মাদ্রাজ হাইকোর্ট। বিচারপতি জি আর স্বামীনাথন এবং বিচারপতি এম ডি সুমতির ডিভিশন বেঞ্চের কথায়, ‘হোমমেকার’ শব্দটি লিঙ্গনিরপেক্ষ। তাই শুধু মহিলারাই সংসার সামলাবেন, এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সময় এসেছে। সেক্ষেত্রে, আজকের দিনে ‘হাউস হাজব্যান্ড’-এর ধারণাও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করা উচিত।
বিচারপতি জি আর স্বামীনাথন এবং বিচারপতি এম ডি সুমতির ডিভিশন বেঞ্চ গত ২৩ সেপ্টেম্বরের রায়ে বলে, “যদি হাউস ওয়াইফ থাকতে পারেন, তা হলে হাউস হাজব্যান্ডও থাকতে পারেন। আজকের দিনে এটিই নিউ নর্মাল হয়ে ওঠার প্রয়োজন রয়েছে।
‘হাউস হাজব্যান্ড’ কেন নয়?
আদালত উল্লেখ করেছে, গৃহস্থালির কাজের একটি বিশেষ মূল্য রয়েছে বলে আগেই স্বীকৃতি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। মাদ্রাজ হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, “ভারতীয় সমাজের ইতিহাস বলছে, পরিবারকে কেন্দ্র করেই বিবাহের ধারণা গড়ে উঠেছে। সেখানে স্বামীকে পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব পালন করা এবং স্ত্রীকে সংসার সামলানোর ভূমিকায় দেখা হত। তবে আদালতের মতে, দু’টি ভূমিকাই সমান সম্মানের।
ডিভিশন বেঞ্চ আরও বলেছে, গত কয়েক দশকে এই সামাজিক কাঠামোয় পরিবর্তন এসেছে। একসময় মহিলারা নিজেদের ‘হাউস ওয়াইফ’ হিসেবে পরিচয় দিতে দ্বিধা করতেন না। এখন অনেকেই ‘শুধু গৃহবধূ’ বলতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু গৃহবধূ হওয়ার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই বলেই মন্তব্য করেছে আদালত।
কেরিয়ার ও বিয়ের সমীকরণ নিয়েও পর্যবেক্ষণ
মহিলাদের মধ্যে কেরিয়ার নিয়ে সচেতনতা ক্রমশ বাড়ছে বলেও উল্লেখ করেছে হাইকোর্ট। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র এবং অন্যান্য পেশায় কর্মরত মহিলাদের ক্ষেত্রে কেরিয়ার ও দাম্পত্য জীবনের ভারসাম্য অনেক সময় সম্পর্কের উপর প্রভাব ফেলছে বলে পর্যবেক্ষণ বেঞ্চের।
আদালত বলেছে, কিছু কর্মজীবী মহিলা বিয়েকে তাঁদের পেশাগত উন্নতির পথে বাধা হিসেবে দেখছেন এবং সেই কারণে বিয়ে না করার সিদ্ধান্তও নিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতে স্বামীরাও যদি সংসার সামলানোর দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসেন, তা হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে বলে মত ডিভিশন বেঞ্চের।
চিকিৎসক দম্পতির বিবাহবিচ্ছেদের মামলা
এক চিকিৎসক দম্পতির বিয়ে সংক্রান্ত সংমামলার শুনানির সময় এই পর্যবেক্ষণ করেছে মাদ্রাজ হাইকোর্ট। স্বামী ও স্ত্রী দু’জনেই পারিবারিক আদালতের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। স্ত্রী দাম্পত্য অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আবেদন করেছিলেন। অন্যদিকে, নিষ্ঠুরতার অভিযোগ তুলে বিবাহবিচ্ছেদ চেয়েছিলেন স্বামী। পারিবারিক আদালত দু’টি আবেদনই খারিজ করে দেয়।
হাইকোর্ট মামলার তথ্য পর্যালোচনা করে জানতে পারে, স্ত্রী পেশায় দন্ত চিকিৎসক। স্বামী যখন কার্ডিয়োলজিতে উচ্চতর যোগ্যতা অর্জনের জন্য পড়াশোনা করছিলেন, তখন স্ত্রী নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে থেকে তাঁদের দুই সন্তানের দেখাশোনা করেন। পরে স্বামী শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতে না চাওয়ার কথা জানালে দাম্পত্য সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হয়।
স্ত্রীর ত্যাগের কথাও উল্লেখ আদালতের
স্ত্রীর বক্তব্য ছিল, সংসার ও সন্তানদের দেখাশোনার জন্য তাঁকে নিজের পড়াশোনা ও কেরিয়ারে অনেকটাই আপস করতে হয়েছে। সেই সময় স্বামী নিজের পেশাগত দক্ষতা ও যোগ্যতা বাড়ানোর দিকে মন দিতে পেরেছিলেন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, স্বামী যখন নিজের পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন, তখন সংসার ও দুই সন্তানের দায়িত্ব সামলানোর কারণে স্ত্রীর পেশাগত দক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবারের দায়িত্ব পালনে স্ত্রীর অবদান স্বামীর স্বীকার করা উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করে আদালত।
২.৫ কোটি টাকার আর্থিক বন্দোবস্ত
শেষ পর্যন্ত আদালত স্বামীকে স্ত্রীর জন্য ন্যায্য আর্থিক বন্দোবস্তের প্রস্তাব দিতে বলে। স্বামী মোট ২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকার বন্দোবস্তের প্রস্তাব দেন এবং স্ত্রী তাতে সম্মতি জানান।
সম্পর্ক আর পুনরুদ্ধারের অবস্থায় নেই বলে মনে করে শেষ পর্যন্ত বিবাহবিচ্ছেদের অনুমতি দেয় হাইকোর্ট। তবে শর্ত হিসেবে স্বামীকে তিন মাসের মধ্যে স্ত্রীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা জমা দিতে বলা হয়েছে। এর পর এক বছরের মধ্যে তাঁদের দুই নাবালক সন্তানের নামে ৫০ লক্ষ টাকা করে জমা করতে হবে।
