SC: ‘হ্রাস পাচ্ছে’ ভারতের জন্মহার! তাই এবার দুই সন্তান নীতি নিয়ে বড় পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের
SC On Two-Child Policy: এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট মহারাষ্ট্রের কাকোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের সাবেক সরপঞ্চ মঙ্গলা ভীমরাওয়ের অযোগ্যতার নির্দেশ খারিজ করে দিয়েছে। মহারাষ্ট্র ভিলেজ পঞ্চায়েত আইন, ১৯৫৯ (২০০০ সালের সংশোধনী)-এর অধীনে তৃতীয় সন্তানের জন্ম দেওয়ায় মঙ্গলাকে তাঁর পদ থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। বম্বে হাইকোর্টও এই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছিল।

নয়াদিল্লি: ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে দুইয়ের বেশি সন্তান থাকলে পঞ্চায়েত বা পুরসভার মতো স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষেত্রে অযোগ্য ঘোষণার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এই আইনগুলোর আসল উদ্দেশ্য ও প্রাসঙ্গিকতা দুই বর্তমানে হারিয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, ভারতে দ্রুত হ্রাস পাওয়া জন্মহার বা ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেট’ এর প্রেক্ষাপটে দুইয়ের বেশি সন্তান থাকা ব্যক্তিদের স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে অযোগ্য ঘোষণা করার আইনগুলি তাদের মূল উদ্দেশ্য ও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। ২০০৩ সালের ‘জাভেদ বনাম হরিয়ানা রাজ্য’ মামলার রায় পর্যালোচনার জন্য এটি লার্জার বেঞ্চে স্থানান্তর করেছে।
২০০৩ সালের রায়ের পুনঃমূল্যায়ন ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০০৩ সালে ‘জাভেদ বনাম হরিয়ানা রাজ্য’ মামলায় তিন বিচারপতির বেঞ্চ ‘হরিয়ানা পঞ্চায়েতি রাজ আইন, ১৯৯৪’-এর দুই-সন্তান নীতির সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রেখেছিল। তবে সাম্প্রতিক মামলায় বিচারপতি পি এস নরসিংহ এবং বিচারপতি অলোক আরাধের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই রায়ের পুনঃমূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।
আদালত জানায়, ২০০৩ সালে যখন দুই-সন্তান নীতিকে সমর্থন করা হয়েছিল, তখন ভারতে মোট প্রজনন হার ছিল ৩। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১.৯-এ, যা জনসংখ্যা স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিস্থাপন স্তর বা ‘রিপ্লেসমেন্ট রেট’ এরও নিচে। এর ফলে নিকট ভবিষ্যতে দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়বে এবং কর্মক্ষম যুবশক্তির অনুপাত হ্রাস পাবে।
মৌলিক অধিকার ও প্রজনন স্বাধিকার
রায় দেওয়ার সময় বিচারপতি নরসিংহ বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দুইয়ের বেশি সন্তান থাকার অপরাধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার যে আইন রয়েছে, তা আজ প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। গত কয়েক দশকে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের যে ভয় ছিল, তা ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তনের কারণে দূর হয়েছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, এই ধরনের আইন এক বিরাট সংখ্যক নাগরিককে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব করার থেকে বাদ দেয়, যার সঙ্গে আদতেও জনপ্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতার কোনও যুক্তিযুক্ত সম্পর্ক নেই। এটি একজন নাগরিককে সন্তান ধারণ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার মধ্যে ‘আইদার ওর’ অর্থাৎ একটি অপশনকে বেছে নেওয়ার মধ্যে দাঁড় করায়। যা সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা ‘প্রজনন স্বাধিকার’কে সরাসরি লঙ্ঘন করে।
সাবেক সরপঞ্চের অযোগ্যতার আদেশ খারিজ
এই পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট মহারাষ্ট্রের কাকোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের সাবেক সরপঞ্চ মঙ্গলা ভীমরাওয়ের অযোগ্যতার নির্দেশ খারিজ করে দিয়েছে। মহারাষ্ট্র ভিলেজ পঞ্চায়েত আইন, ১৯৫৯ (২০০০ সালের সংশোধনী)-এর অধীনে তৃতীয় সন্তানের জন্ম দেওয়ায় মঙ্গলাকে তাঁর পদ থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। বম্বে হাইকোর্টও এই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছিল। হাইকোর্টের ওই নির্দেশ বাতিল করে সুপ্রিম কোর্ট মঙ্গলার পক্ষে রায় দেয়।
রাজ্যগুলির নীতিতে বৈষম্য
মামলার শুনানি চলাকালীন আদালতে পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এই আইনের প্রয়োগে ব্যাপক বৈষম্য দেখা গিয়েছে:
-
১৫টি রাজ্যে এমন কোনও আইন বা নিষেধাজ্ঞা নেই।
-
৭টি রাজ্য পূর্বে এই দুই-সন্তান নীতি চালু করলেও পরবর্তীতে তা বাতিল করেছে।
-
৬টি রাজ্যে এখনও এই নিয়ম বলবৎ রয়েছে—অসম, গোয়া, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, ওড়িশা এবং উত্তরাখণ্ড।
সুপ্রিম কোর্টের এই অবস্থানের ফলে অসম, মহারাষ্ট্র বা গুজরাটের মতো রাজ্যগুলিতে বহাল থাকা দুই-সন্তান নীতির ভবিষ্যৎ এখন বড় প্রশ্নের মুখে। বৃহত্তর বেঞ্চের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করবে ভারতে স্থানীয় নির্বাচন ও প্রজনন অধিকারের আগামী দিনের আইনি দিকনির্দেশনা।
