
নয়াদিল্লি: ২০১৬-র পর আবার ২০২৬! সেই একই বিতর্ক ফিরে এল ঘুরে ফিরে এল বিতর্কিত ভোজশালায়। ২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার সরস্বতী পুজো। আবার ওই দিনই পবিত্র জুম্মার নমাজ পাঠ রয়েছে। ফলে শুক্রবার কোন সম্প্রদায়ের মানুষ ভোজশালায় ঢুকতে পারবেন, এই নিয়ে চলছিল বিবাদ। শেষ পর্যন্ত বিতর্কের জল গড়াল সুপ্রিম কোর্টে।
দু’পক্ষই শুক্রবার ১০৩৪ খ্রিস্টাব্দে ভোজ রাজা নির্মিত স্থাপত্যের ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চায়। শেষ পর্যন্ত বিতর্কের জল গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে। বৃহস্পতিবার শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ই মধ্য প্রদেশের ভোজশালায় প্রার্থনা ও পুজো দুই করতে পারবে। তবে মেনে চলতে হবে আদালতের বিধি। সুপ্রিম কোর্টের সাফ নির্দেশ, নমাজ পড়ার জন্য দুপুর ১টা থেকে ৩টের পর্যন্ত সময়।। প্রার্থনার জন্য ভোজশালা চত্বরের ভিতরে একটি আলাদা জায়গা এবং যাতায়াতের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক ঢোকার ও বেরোনোর রাস্তা থাকবে। নমাজ মিটে গেলেই ভিড় সরিয়ে দিতে হবে। একইভাবে, হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য বসন্ত পঞ্চমীর ঐতিহ্যবাহী পুজো ও অনুষ্ঠানের জন্য ওই একই চত্বরে আলাদা জায়গার ব্যবস্থা করা হবে।
দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রদেশের ভোজশালা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। হিন্দুরা দাবি করেন, ভোজ রাজা এই মন্দির তৈরি করেন বাগ্দেবীর জন্য। মন্দিরের ভিতর পরিষ্কার করার সময় মা সরস্বতীর ভাঙা মূর্তিও মেলে। মন্দিরের দেওয়ালে সংস্কৃত শ্লোক খোদাই করা অবস্থায় পাওয়া যায়। এমনকি, উদ্ধার হয় একটি যজ্ঞকুণ্ডও। শুক্রবার ওই যজ্ঞকুণ্ডেই যজ্ঞ হওয়ার কথা ধূমধাম করে। কিন্তু মুসলিমরাও ওই একই ভোজশালাকে কমল মওলা মসজিদ বলে দাবি করেন। মুসলিম সংগঠনগুলির দাবি, গত ৭০০ বছর ধরে তাঁদের পূর্বপুরুষরা সেখানেই নমাজ পাঠ করে আসছেন। এমনকি ব্রিটিশ নথিতেও ভোজশালাকে মসজিদ বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।
পাল্টা হিন্দুরা দাবি করেন, মন্দির ভেঙে আলাউদ্দিন খিলজির মতো অত্যাচারী শাসক সেখানে মসজিদ বানিয়েছিলেন। এই বিতর্ক নিয়েই গত ২০ বছর ধরে রয়েছে মধ্যপ্রদেশের ধর জেলার বিতর্কিত ভোজশালা। শেষ পর্যন্ত ২০২৪-এ আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI) জানিয়ে দেয়, ভোজশালা একদা হিন্দু মন্দির ছিল। পরে সেখানে মসজিদ তৈরি হয়। বর্তমানে ভোজশালা চত্বরের মূল কাঠামোয় ১০৬টি স্তম্ভ ও ৮২টি অর্ধস্তম্ভ রয়েছে। মধ্যযুগীয় সূক্ষ্ম খোদাই করা নকশা দিয়ে সে সব সাজানো। এছাড়াও এমন অনেক পাথর পাওয়া যায়, যেখানে সংস্কৃত এবং প্রাকৃত ভাষায় সাহিত্যকর্ম খোদাই করা আছে। এই খোদাই করা লেখাগুলির মধ্যে ব্যাকরণ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় স্তোত্র বা মন্ত্রও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এবছর ২৩ জানুয়ারি দিনভর ভোজ উৎসব কমিটি ওই চত্বরে সরস্বতী পুজো করার অনুমতি চায়। সূর্যোদয় থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ধূমধাম করে পুজোর আয়োজন করার অনুমতি চাওয়া হয়। অন্যদিকে, মুসলিম সংগঠনগুলি ওই একই দিনে নমাজ পড়ার অনুমতি চায়। গত ২৩ বছর ধরে এই ভোজশালায় মঙ্গলবার করে হিন্দুরা পুজো করে আসছেন। শুক্রবার আবার মুসলিমরা সেখানেই জুম্মার নমাজ পড়েন। এই বছর সরস্বতী পুজো শুক্রবার হওয়ায় তৈরি হয় জটিলতা। দু’পক্ষই একইদিনে ভোজশালার ভিতরে ঢোকার অনুমতি চায়। ধর জেলার পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। যে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা রুখতে প্রায় আট হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়। নামানো হয় সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স ও RAF-কে। সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারি চালাচ্ছে প্রশাসন। সঙ্গে টহল দিচ্ছে পুলিশ। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারেও সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয় প্রশাসন। আজ সুপ্রিম নির্দেশের পাশাপাশি মূল মামলাটি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চকে শুনতে সুপারিশ করেছে শীর্ষ আদালত। ASI-কে মুখবন্ধ করা খামে তাদের আসল রিপোর্টটি জমা দিতে বলা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়কে স্বাগত জানিয়েছে সবপক্ষ।