
১৫০০ শতাব্দীর অস্থির সময়ে ভারতে যখন বিদেশি আক্রমণ জর্জরিত ভারত, যখন ধর্মান্ধতায় ডুবে গোটা দেশ তখন পঞ্জাবের পবিত্র মাটি থেকে প্রার্থনা, সততা ও সেবার মন্ত্রে এক জাতিভেদহীন ও আত্মমর্যাদাশীল সমাজ গড়ার ডাক দেন গুরু নানক দেব জি। তাঁর দেখানো পথ ধরে পরবর্তী দশ জন গুরু মানবিকতা, সাম্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অমর ইতিহাস রচনা করেছেন।
গুরু নানক দেব (১৪৬৯–১৫৩৯)
শিখ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গুরু নানক দেব জি বাবরের আক্রমণের সেই কঠিন সময়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরব হন। তিনি এক ঈশ্বর বা ‘অকাল পুরখ’-এর আদর্শ প্রচার করেন এবং ‘নাম জপো’, ‘কিরত করো’ ও ‘ভান্দ ছাকো’-র (প্রার্থনা, সততা ও সেবার) মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ ও কর্মঠ সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেন।
গুরু অঙ্গদ দেব (১৫০৪–১৫৫২)
দ্বিতীয় গুরু হিসেবে উঠে আসেন গুরু অঙ্গদ দেব। স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষায় ‘গুরুমুখী’ লিপির প্রচার ও প্রসার ঘটান। কেবল আধ্যাত্মিকতা নয়, যুবকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করতে তিনি ‘মল্ল আখড়া’ বা কুস্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র শুরু করেন, যা ছিল ধর্ম রক্ষার প্রথম বিপ্লবী পদক্ষেপ।
গুরু অমর দাস (১৪৭৯–১৫৭৪)
গুরু অমর দাস সামাজিক বৈষম্য দূর করতে ‘পহেলে পঙ্গত, পিছে সঙ্গত’ প্রথা চালু করেন। এই প্রথায় একইসঙ্গে সকলে বসে লঙ্গরে খাবার খেতে হতো। সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত করতে তিনি ২২টি ‘মঞ্জি’ বা প্রচার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে শিখ সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেন।
গুরু রাম দাস (১৫৩৪–১৫৮১)
চতুর্থ গুরু হিসাবে বরাবরই শোনা যায় রাম দাস জি-র কথা। তাঁর হাত ধরেই পবিত্র অমৃতসর শহর এবং ‘অমৃত সরোবরের’ প্রতিষ্ঠা হয়। তিনি শিখ বিবাহ রীতি ‘লাবণ’ এবং আর্তমানবতার সেবায় সম্পদ সংগ্রহের জন্য ‘মসন্দ’ প্রথা চালু করেন, যা শিখ ঐতিহ্যকে এক বিশেষ বিশ্বজনীন পরিচয় দান করে।
গুরু অরজান দেব (১৫৬৩–১৬০৬)
তিনি শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ ‘আদি গ্রন্থের’ সংকলন করেন। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের ধর্মীয় নিপীড়নের কাছে মাথা নত না করে তিনি তপ্ত লোহার উপর বসে চরম আত্মত্যাগ করেন। তাঁর এই বলিদান শিখ ইতিহাসে ভক্তি ও বীরত্বের এক নতুন মোড় এনে দেয়।
গুরু হরগোবিন্দ সিং (১৫৯৫–১৬৪৪)
বাবা শহীদ হওয়ার পর তিনি শিখদের সামরিক শক্তিতে দীক্ষিত করেন। তিনি ‘মীরি’ ও ‘পীরি’ নামক দুটি তলোয়ার ধারণ করে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক শক্তির সমন্বয় ঘটান এবং অমৃতসরে ‘অকাল তখত’ স্থাপন করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
গুরু হর রাই (১৬৩০–১৬৬১)
সপ্তম গুরু হিসেবে গুরু হর রাই তিনি শিখ সামরিক বাহিনীকে আরও সুশৃঙ্খল করেন। অত্যন্ত দয়ালু হওয়া সত্ত্বেও তিনি মুঘল গোঁড়ামির বিরুদ্ধে আপসহীন ছিলেন।
গুরু হর কিষাণ (১৬৫৬–১৬৬৪)
মাত্র পাঁচ বছর বয়সে গুরুপদে আসীন হন। এই ‘বালক গুরু’ দিল্লিতে কলেরার মহামারী চলাকালীন নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে আর্ত মানুষের সেবাও করেন। মাত্র আট বছর বয়সে সেবামূলক কাজ করতে গিয়েই তিনি জীবন উৎসর্গ করেন।
গুরু তেগ বাহাদুর (১৬২১–১৬৭৫)
কাশ্মীরি পণ্ডিতদের জোর করে ধর্ম পরিবর্তন রুখতে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন তিনি। ধর্মীয় স্বাধীনতার দাবিতে তিনি মুঘল সম্রাট ওরঙ্গজেবের মুখোমুখিও হন। দিল্লির চাঁদনি চকে তাঁর মহান আত্মত্যাগের কারণে তাঁকে ‘হিন্দ দি চাদর’ বা ভারতীয় বিশ্বাসের রক্ষাকর্তা হিসেবে অভিহিত করা হয়।
গুরু গোবিন্দ সিং (১৬৬৬–১৭০৮)
দশম গুরু গোবিন্দ সিং জি ১৬৯৯ সালে ‘খালসা পন্থ’ গঠন করে শিখদের এক অপরাজেয় যোদ্ধা জাতিতে রূপান্তরিত করেন। তিনি জাতিভেদ মুছে দিয়ে ‘সিং’ ও ‘কৌর’ উপাধি এবং ‘পাঁচ কড়ক’ প্রথা চালু করেন। নিজের চার পুত্রকে হারিয়েও তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রেখেছিলেন।