Consumer Rights in India: একজন ক্রেতা হিসেবে আপনি কী কী দাবি করতে পারেন?
Consumer Protection Act 2019 and CCPA: নষ্ট বা ত্রুটিপূর্ণ পণ্য হাতে পাওয়া কিংবা কাস্টমার সার্ভিসের চ্যাটবট থেকে কোনও উত্তর না মেলা মানেই যে একজন ক্রেতার সমস্ত বিকল্প শেষ হয়ে গেল, তা নয়। আজকের ‘YOUR INDIA’ কলামে সন্তোষ নায়ার আলোচনা করেছেন ভোক্তা সুরক্ষা আইন, ২০১৯, ভোক্তা কমিশন, পণ্যের দায়বদ্ধতা এবং সেন্ট্রাল কনজিউমার প্রোটেকশন অথরিটি (CCPA)-র ক্ষমতা নিয়ে।

ধরা যাক, এক ব্যক্তি অনলাইনে একটি ম্যাট্রেস বা গদি অর্ডার করলেন। কিন্তু সেটি হাতে পাওয়ার পর দেখা গেল, পণ্যটি ক্ষতিগ্রস্ত। বিক্রেতা মেসেজের উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। এমনকী সংস্থার অ্যাপেও অভিযোগ জানানোর কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সেখানে একটি সাধারণ চ্যাটবট বারবার তিনটি একই অসহায়ক উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। ওই ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত ধরে নিলেন, ক্ষতি মেনে নেওয়া এবং পরিচিতদের ওই ব্র্যান্ড সম্পর্কে সতর্ক করা ছাড়া তাঁর আর কিছুই করার নেই। কিন্তু তিনি হয়তো জানেন না, ঠিক এই ধরনের সমস্যার সমাধানের জন্যই ভারতীয় আইনে রয়েছে নির্দিষ্ট ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা।
ভারতের ভোক্তা সুরক্ষা আইন, ২০১৯ (Consumer Protection Act, 2019) ১৯৮৬ সালের পুরনো আইনকে প্রতিস্থাপন করে। কারণ, সময়ের সঙ্গে ভারতীয়দের কেনাকাটার ধরন অনেকটাই বদলে গিয়েছে। এখন অ্যাপ, অনলাইন মার্কেটপ্লেস এবং এমন সব বিক্রেতার কাছ থেকেও মানুষ কেনাকাটা করেন, যাঁদের অবস্থান ক্রেতার অজানা কোনও শহরে। নতুন আইনটি তৈরি করার সময় অনলাইন বাণিজ্যের বিষয়টি বিশেষভাবে মাথায় রাখা হয়েছিল। এর ফলে এমন কিছু পরিবর্তন এসেছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের শহর থেকেই কি ভোক্তা অভিযোগ দায়ের করা যায়?
নতুন আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলির মধ্যে একটি হল, অভিযোগ দায়েরের জায়গা সংক্রান্ত নিয়মে বদল। আগের আইনে সাধারণত বিক্রেতা যে শহরে থাকতেন, সেই শহরেই ক্রেতাকে অভিযোগ দায়ের করতে হত। কিন্তু ২০১৯ সালের আইনে ক্রেতা নিজের বসবাসের জায়গা কিংবা কর্মস্থল থেকেই অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। পরিবর্তনটি শুনতে ছোট মনে হলেও বাস্তবে এর গুরুত্ব অনেক। কারণ, ক্ষতিগ্রস্ত একটি ম্যাট্রেস কিংবা ত্রুটিপূর্ণ মোবাইল ফোনের জন্য আইনি লড়াই করতে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করা অধিকাংশ মানুষের পক্ষেই সম্ভব নয়।
এই আইনে ভোক্তা বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তিন স্তরবিশিষ্ট কমিশন ব্যবস্থাও তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি কমিশনের নিজস্ব আর্থিক এক্তিয়ার নির্দিষ্ট করা রয়েছে।
- জেলা ভোক্তা বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (District Consumer Disputes Redressal Commission): ১ কোটি টাকা পর্যন্ত দাবি সংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি করে।
- রাজ্য ভোক্তা কমিশন (State Commission): ১ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত দাবি সংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি করে।
- জাতীয় ভোক্তা কমিশন (National Commission): ১০ কোটি টাকার বেশি দাবি সংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি করে।
এই ব্যবস্থার ফলে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ টাকার পণ্য বা পরিষেবা সংক্রান্ত অধিকাংশ সাধারণ ভোক্তা বিরোধ নিজের এলাকার কাছাকাছি মেটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর জন্য ব্যয়বহুল আইনজীবী নিয়োগ কিংবা দূরের আদালতে যাওয়ার প্রয়োজনও সব ক্ষেত্রে হয় না।
CCPA-র হাতে আসলে কী কী ক্ষমতা রয়েছে?
অভিযোগের নিষ্পত্তির পাশাপাশি ২০১৯ সালের আইনে তৈরি করা হয়েছে একটি নতুন নিয়ন্ত্রক সংস্থা— সেন্ট্রাল কনজিউমার প্রোটেকশন অথরিটি (Central Consumer Protection Authority বা CCPA)। ভারতীয় ভোক্তা সুরক্ষা আইনের ইতিহাসে এর আগে কোনও আইনে এমন ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থার অস্তিত্ব ছিল না।
CCPA নিজের উদ্যোগেই পদক্ষেপ করতে পারে। অর্থাৎ, কোনও ব্যক্তির অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকেও এই সংস্থা তদন্ত শুরু করতে পারে। অন্যায্য বাণিজ্যিক পদ্ধতির বিরুদ্ধে তদন্ত করা, পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া এবং বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের জন্য সংস্থাগুলিকে জরিমানা করার ক্ষমতা রয়েছে CCPA-র হাতে।
এর গুরুত্ব যথেষ্ট। কারণ, ভোক্তাদের অনেক সমস্যাই একসঙ্গে হাজার হাজার মানুষকে প্রভাবিত করে। যেমন, দেশজুড়ে কোনও বিজ্ঞাপন প্রচারে মিথ্যা দাবি করা কিংবা কোনও পণ্যের একটি নির্দিষ্ট ব্যাচে ধারাবাহিকভাবে ত্রুটি থাকা। এই ধরনের ঘটনায় প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতাকে আলাদা করে মামলা দায়ের করতে বলা বাস্তবে কোনও কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা হতে পারে না।
নতুন আইনে প্রোডাক্ট লায়াবিলিটি বা পণ্যের দায়বদ্ধতা বিষয়টিকেও স্বতন্ত্র আইনি ধারণা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কোনও পণ্যের উৎপাদনগত ত্রুটি, নকশার ভুল কিংবা পরিচিত ঝুঁকি সম্পর্কে যথাযথ সতর্কবার্তা না দেওয়ার কারণে যদি কারও ক্ষতি হয়, তাহলে ক্রেতা সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতকারককে দায়ী করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে বিক্রেতা এবং পরিষেবা প্রদানকারীকেও সেই ক্ষতির জন্য দায়বদ্ধ করা যেতে পারে। অর্থাৎ, বিষয়টি শুধু টাকা ফেরত বা পণ্য বদলে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
ক্ষতিগ্রস্ত ম্যাট্রেসের ক্রেতার ক্ষেত্রে এই আইনের প্রয়োগ কীভাবে হবে?
এবার শুরুতে উল্লেখ করা সেই ব্যক্তির কথাই ভাবুন, যিনি অনলাইনে ম্যাট্রেস কিনে ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য পেয়েছেন। তিনি বিক্রেতার শহরে না গিয়েই নিজের শহর থেকে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। তাঁর দাবি যদি জেলা ভোক্তা কমিশনের এক্তিয়ারভুক্ত হয়, যা অধিকাংশ ব্যক্তিগত ভোক্তা বিরোধের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে, তাহলে আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য বাধ্যতামূলকভাবে আইনজীবী নিয়োগের প্রয়োজন নেই।
অনেক রাজ্যে ই-ফাইলিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। ফলে অভিযোগ দায়ের করার জন্য তাঁকে আদালতে সশরীরে যাওয়ার প্রয়োজনও নেই। আর যদি তাঁর পাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যটি আরও বড় কোনও সমস্যার ইঙ্গিত দেয়, অর্থাৎ অন্য ক্রেতারাও যদি একই ধরনের ত্রুটির অভিযোগ জানিয়ে থাকেন, তাহলে এই ধরনের বিষয়ই CCPA-র তদন্তের আওতায় আসতে পারে। প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতাকে আলাদা করে অভিযোগ দায়ের করতে না হলেও বৃহত্তর পরিসরে তদন্ত শুরু করার সুযোগ রয়েছে এই সংস্থার।
কাস্টমার সার্ভিস থেকে সাহায্য না পেলে কী করবেন?
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, ভোক্তাদের প্রতিটি অভিযোগ দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে নিষ্পত্তি হবে। ভারতের ভোক্তা কমিশনগুলিতেও বিচারব্যবস্থার অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো বিপুল সংখ্যক মামলা জমে রয়েছে। কাগজে-কলমে কোনও আইনি অধিকার থাকা আর বাস্তবে সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারার মধ্যে যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। সেই অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার অভাবই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
ভারতের অধিকাংশ ক্রেতাই কখনও ভোক্তা সুরক্ষা আইন পড়ে দেখেননি। CCPA সম্পর্কে অনেকেই জানেন না। তাঁদের মধ্যে অনেকেরই ভুল ধারণা, সংস্থার নিজস্ব কাস্টমার সার্ভিস চ্যাটবটই হল কোনও অভিযোগের ক্ষেত্রে শেষ কথা। কিন্তু বাস্তবে তা খুব কম ক্ষেত্রেই সত্যি। বরং সেটি সাধারণত অভিযোগ জানানোর প্রথম দরজা, এবং অনেক সময় সবচেয়ে কম কার্যকর দরজাও। অথচ এই ব্যবস্থার পিছনে আরও একাধিক পথ খোলা রাখার উদ্দেশ্যেই আইনটি তৈরি করা হয়েছে।
একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আইনের প্রতিটি ধারা মুখস্থ রাখা নয়। বরং পরের বার কোনও সংস্থা যখন তাঁর বৈধ অভিযোগ এড়িয়ে যাবে, উপেক্ষা করবে কিংবা গুরুত্ব দিতে অস্বীকার করবে, তখন তাঁর মনে রাখা দরকার, সাধারণ ক্রেতাদের জন্যই ভারতীয় ভোক্তা সুরক্ষা আইন নতুন করে তৈরি করা হয়েছে। যাতে তাঁরা নিজেদের কাছাকাছি জায়গা থেকেই পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ করতে পারেন এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আরও কার্যকর ব্যবস্থা পান।
সূত্র: ভারত সরকারের ভোক্তা সুরক্ষা আইন, ২০১৯। অভিযোগ দায়েরের এক্তিয়ার, ই-কমার্স, পণ্যের দায়বদ্ধতা এবং সেন্ট্রাল কনজিউমার প্রোটেকশন অথরিটির ক্ষমতা সংক্রান্ত আইনি বিধান। ২০১৯ সালের আইনের অধীনে ভোক্তা বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা এবং পরিষেবায় ত্রুটি সংক্রান্ত আইনি বিশ্লেষণ।
