Road maintenance in India: রাস্তাটি কার অধীনে? গর্ত নিয়ে অভিযোগ করার আগে জেনে নিন…
Road Ownership and Pothole Complaints: রাস্তার একটি গর্ত সাধারণ নাগরিক সমস্যা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু রাস্তার দায়িত্ব কোন কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে, তার উপরেই নির্ভর করে মেরামতির দায়িত্ব। কীভাবে জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক ও পৌরসভার রাস্তার দায়িত্ব ভাগ করা রয়েছে? সঠিক কর্তৃপক্ষকে চেনা কেন অভিযোগ জানানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ? লিখছেন সন্তোষ নায়ার।

নয়াদিল্লি: এক সন্ধ্যায় রাস্তার গর্তে পড়ল একটি দু’চাকার গাড়ি। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি একদিকে বেঁকে গেল। অল্পের জন্য দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেলেন চালক। বিরক্ত হয়ে মনে মনে ‘সরকার’কে গালমন্দ করে ফের গাড়ি চালাতে শুরু করলেন তিনি। কিন্তু প্রশ্ন হল, রাস্তার ওই গর্তের জন্য ঠিক কোন সরকার দায়ী? সত্যি বলতে, এর উত্তর নির্ভর করছে রাস্তাটি কার অধীনে রয়েছে তার উপর। আর অধিকাংশ মানুষই জানেন না, কীভাবে তা বোঝা সম্ভব।
ভারতে রাস্তারও বিভিন্ন স্তর রয়েছে, অনেকটা সরকারের বিভিন্ন স্তরের মতোই। রাজ্য ও শহরের মধ্যে সংযোগকারী জাতীয় সড়ক তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ বা ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়া (NHAI)-র। এই সংস্থা কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রকের অধীন।
একই ভাবে, একটি রাজ্যের বিভিন্ন শহর ও এলাকার মধ্যে সংযোগকারী রাজ্য সড়কের দায়িত্ব সাধারণত সংশ্লিষ্ট রাজ্যের পূর্ত দফতর বা PWD-র। জেলা ও গ্রামীণ সড়কের দায়িত্বও অনেক ক্ষেত্রে পূর্ত দফতরের হাতে থাকে। গ্রামাঞ্চলের কিছু রাস্তার দায়িত্বে থাকে পঞ্চায়েত। অন্যদিকে, শহরের বাড়ির সামনে দিয়ে যে রাস্তা গিয়েছে, যে পথে প্রতিদিন হাঁটাচলা করেন বা গাড়ি চালান সাধারণ মানুষ, সেই রাস্তার দায়িত্ব সাধারণত পৌরসভা বা পৌরনিগমের। অর্থাৎ, চার ধরনের রাস্তা, চার রকমের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ। অথচ কোন রাস্তার দায়িত্ব কার, তা প্রায় কোনও চালকই জানেন না।
রাস্তার দায়িত্ব কার, তা জানা সাধারণ মানুষের জন্য কেন জরুরি?
এটা শুধুমাত্র প্রশাসনিক জটিলতার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা।
কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রক সংসদে যে তথ্য পেশ করেছে, তা অনুযায়ী, ভারতে রাস্তার গর্তের কারণে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা ২০২০ সালে ছিল ১,৫৫৫। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২,৩৮৫। অর্থাৎ, মাত্র পাঁচ বছরে এই ধরনের দুর্ঘটনায় মৃত্যু বেড়েছে ৫৩ শতাংশ। ওই সময়ের মধ্যে গর্তের কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯,৪০০-রও বেশি মানুষ। এই মৃত্যুর অর্ধেকেরও বেশি উত্তর প্রদেশে। শুধুমাত্র ওই রাজ্যেই গর্তের কারণে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৫,১০০-রও বেশি মানুষের।
এগুলিকে নিছক দুর্ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, রাস্তার গর্ত সাধারণত এক রাতের মধ্যে তৈরি হয় না। বর্ষার বৃষ্টিতে রাস্তার উপরিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ধীরে ধীরে গর্ত বড় হতে থাকে। প্রতিদিন ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন অনেকে। তাঁদের চোখের সামনেই গর্ত ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। প্রশ্নটা তাই গর্ত কারও নজরে পড়েছিল কি না, তা নয়। আসল প্রশ্ন, যে কর্তৃপক্ষের সেটি মেরামত করার দায়িত্ব ছিল, তারা কি জানত যে রাস্তাটি তাদেরই অধীনে?
এখানেই সমস্যায় পড়েন সাধারণ মানুষ। কোনও রাস্তা জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক নাকি পৌরসভার অধীন, তা জানা না থাকলে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, সেটাও বোঝা কঠিন। এমনকী, একই পথে যাতায়াতের সময় রাস্তার দায়িত্ব এক কর্তৃপক্ষের হাত থেকে অন্য কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যেতে পারে। শহরের রাস্তার পাশে থাকা পথবাতির দায়িত্ব সাধারণত পৌরসভার। কিন্তু রাস্তার ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সরল নয়। ঠিক কোন রাস্তা, কোন এলাকার মধ্যে রয়েছে, তার উপরেই নির্ভর করে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা।
কীভাবে বুঝবেন, কোন রাস্তার দায়িত্ব কার?
কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলে তা বোঝা সম্ভব। জাতীয় সড়কের নম্বরের আগে সাধারণত ‘NH’ লেখা থাকে। অন্যদিকে, রাজ্য সড়কের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় ‘SH’ চিহ্ন। এই ধরনের রাস্তা শহরের মধ্যে দিয়ে গেলেও সাধারণত পৌরসভার নিয়মিত রাস্তা মেরামতির তালিকার আওতায় পড়ে না। অন্যদিকে, বাড়ি, দোকানপাট ও স্কুলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া সাধারণ রাস্তাগুলির দায়িত্ব সাধারণত সংশ্লিষ্ট পৌরসভা বা পৌরনিগমের।
জাতীয় সড়কে কোনও সমস্যা হলে অভিযোগ জানানোর জন্য ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়ার একটি টোল-ফ্রি হেল্পলাইন রয়েছে। নম্বরটি হল ১০৩৩। জাতীয় সড়কে গর্ত, দুর্ঘটনা কিংবা গাড়ি খারাপ হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যার কথা এই নম্বরে জানানো যায়। রাজ্যগুলির পূর্ত দফতর এবং পৌরসভা ও পৌরনিগমগুলিও এখন ফোন বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করেছে। তবে শহরভেদে এই পরিষেবা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতার যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
অবশ্য, সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর পরেও রাস্তা মেরামতিতে দেরি হলে তার দায় এড়ানো যায় না। বিপজ্জনক রাস্তা দীর্ঘদিন মেরামত না করার জন্য বিভিন্ন সময়ে আদালতের ভর্ৎসনার মুখেও পড়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অভিযোগ যদি ভুল দফতরে পৌঁছয়, তাহলে তা সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছনোর সম্ভাবনাও কমে যায়। প্রশাসনিক ব্যবস্থায় প্রতিটি দফতরের নির্দিষ্ট কাজ ও এক্তিয়ার থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এই জটিলতার অভিজ্ঞতা অনেক সময় একটাই—অভিযোগ জানানো সত্ত্বেও কেউ সাড়া দিচ্ছে না।
অভিযোগ জানানোর আগে একবার জিজ্ঞাসা করুন, রাস্তাটি কার?
পরের বার কোনও দু’চাকার গাড়ি রাস্তার গর্তে পড়লে, গাড়ির চাকা বা অ্যালাইনমেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা আরও ভয়াবহ কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে এই বিষয়টি মনে রাখা জরুরি। প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্ষোভকে কাজে লাগাতে গেলে ফোন করার আগে কিংবা অভিযোগপত্র লেখার আগে একটি অতিরিক্ত প্রশ্ন করতে হবে—রাস্তাটি আসলে কার অধীনে? সেটি মেরামত করার দায়িত্বই বা কার ছিল?
রাস্তাটি কোন দফতরের অধীনে, তা কোনও বিষয় নয় একটি গর্তের কাছে। কিন্তু যে মানুষটি সেই গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হন, তাঁর কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণ ও মহাসড়ক মন্ত্রকের সংসদে পেশ করা গর্তের কারণে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরিসংখ্যান (২০২০–২০২৪), ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অব ইন্ডিয়ার হেল্পলাইন ও দায়িত্ব সংক্রান্ত তথ্য এবং জাতীয় সড়ক, রাজ্য সড়ক ও পৌরসভার রাস্তার শ্রেণিবিভাগ সংক্রান্ত মন্ত্রকের নির্দেশিকা।
