Women in the Workforce: ভারতে মহিলারা কাজ করেন, কতজন পারিশ্রমিক পান?
Indian Women Unpaid Work: ভারতে মহিলাদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু তাঁরা কী ধরনের কাজ করছেন, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মী হিসেবে আরও বেশি মহিলার নাম নথিভুক্ত হওয়ার অর্থ কি সত্যিই আরও বেশি মহিলা উপার্জন করছেন? লিখছেন সন্তোষ নায়ার।

নয়াদিল্লি: একজন মহিলা সকাল থেকেই ব্যস্ত। স্বামীর খাবারের দোকানের জন্য রান্না করছেন। মশলা বাটছেন। ছেঁড়া খাতায় হিসাব রাখছেন। স্বামী অন্য কাজে চলে গেলে ক্রেতাদেরও সামলাচ্ছেন। তাঁকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি কাজ করেন কি না, তাহলে হয়তো উত্তর দেবেন, না, তিনি তো শুধু একটু সাহায্য করেন। ভারতের কর্মসংস্থান সমীক্ষাকে একই প্রশ্ন করা হলে, সাম্প্রতিক সময়ে সেই মহিলাকে অবশ্য অন্যভাবে গণনা করা শুরু হয়েছে।
কাগজে-কলমে ভারতের এই ছবিটা বেশ চমকপ্রদ। পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে বা PLFS-র তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ছ’বছরে মহিলাদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৭-১৮ সালে যা ছিল ২৩.৩ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৪১.৭ শতাংশ। দ্রুত চোখ বুলিয়ে গেলে মনে হবে, ভারতীয় মহিলাদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে এটি এক বিরাট সাফল্য।
কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে সামনে আসে আরও জটিল একটি ছবি।
আরও বেশি মহিলা কি কাজ করছেন, নাকি অবৈতনিক কাজকেও গণনার আওতায় আনা হচ্ছে?
এই বৃদ্ধির বড় অংশই নতুন বেতনের চাকরি কিংবা মহিলাদের পরিচালিত নতুন ব্যবসার কারণে হয়নি। বরং এর পিছনে রয়েছে একটি নির্দিষ্ট কর্মসংস্থান বিভাগ—‘স্বনিযুক্তি’। আর এই বিভাগের মধ্যেও রয়েছে আরও একটি ছোট শ্রেণি, যার নাম ‘পরিবারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে অবৈতনিক সহায়ক’।
গ্রামীণ ভারতের কর্মরত মহিলাদের মধ্যে ৪২.৩ শতাংশ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তাঁরা বাস্তবেই কাজ করেন, অনেক সময় দিনের বেশিরভাগ সময় ধরে কাজ করতে হয় তাঁদের। অথচ সেই কাজের জন্য তাঁরা নিজেরা সরাসরি কোনও মজুরি পান না। অন্যদিকে, একই সময়ে বেতনের চাকরি এবং দৈনিক মজুরির বিনিময়ে কাজ করা মহিলাদের অনুপাত আসলে কমেছে।
তাই সাম্প্রতিক পরিস্থিতির একটি সৎ ব্যাখ্যা হতে পারে এই যে, আগের তুলনায় এখন আরও বেশি ভারতীয় মহিলার কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে অনেক কম মহিলাই সেই কাজের জন্য আলাদা পারিশ্রমিক পাচ্ছেন।
এই বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করে আরও একটি পরিসংখ্যান। ভারতের টাইম ইউজ সার্ভে বা সময় ব্যবহারের সমীক্ষা অনুযায়ী, মহিলারা প্রতিদিন গড়ে ৩০৫ মিনিট, অর্থাৎ পাঁচ ঘণ্টারও কিছু বেশি সময় অবৈতনিক গৃহস্থালির কাজ এবং পরিচর্যার কাজে ব্যয় করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে একই কাজে সময় লাগে গড়ে প্রায় ১৬৩ মিনিট, অর্থাৎ মহিলাদের অর্ধেকেরও কম।
একই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, একটি পূর্ণ দিনে মাত্র ২৫ শতাংশ মহিলা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ৭৫ শতাংশ।
এই দুটি তথ্য একসঙ্গে দেখলে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়। অধিকাংশ ভারতীয় মহিলা ইতিমধ্যেই কাজ করছেন। অনেক সময় প্রতিদিন দীর্ঘক্ষণ ধরে কাজ করতে হয় তাঁদের। আসল প্রশ্নটা কখনওই ছিল না, মহিলারা কাজ করেন কি না। প্রশ্ন হল, সেই কাজের জন্য তাঁরা পারিশ্রমিক পাচ্ছেন কি না, কাজটি দৃশ্যমান হচ্ছে কি না এবং তাঁদের পরিবার, নিয়োগকর্তা ও দেশের পরিসংখ্যান—সব ক্ষেত্রেই সেই কাজকে আদৌ কাজ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে কি না।
একটি সাধারণ পরিবারের মধ্যে অবৈতনিক কাজ কেমন?
একটি সাধারণ পরিবারের কথা ভাবুন। পরিবারের দোকানের হিসাব রাখছেন একজন মহিলা। তিনি এমন একটি কাজ করছেন, যা দক্ষতাসাপেক্ষ এবং ব্যবসা চালানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তাঁর স্বামীকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তাঁর স্ত্রী কী করেন, তাহলে তিনি হয়তো বলবেন, “ও কাজ করে না।” কারণ, এই কাজের জন্য স্ত্রীর হাতে আলাদা করে কোনও বেতন তুলে দেওয়া হয় না। অথচ অর্থনীতির একটা বড় অংশ নীরবে এই ধরনের শ্রমের উপর নির্ভর করে চলে। কিন্তু এই শ্রমের জন্য মহিলারা সচরাচর আলাদা করে স্বীকৃতি, কৃতিত্ব কিংবা পারিশ্রমিক পান না।
এটা শুধুই সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের গল্প নয়, যদিও এই দুইয়েরই একটা ভূমিকা রয়েছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতাও। অনেক মহিলা স্বনিযুক্তি কিংবা পরিবারের ব্যবসায় অবৈতনিক কাজ বেছে নেন এই কারণে নয় যে, সেটাই তাঁদের প্রথম পছন্দ। বরং নিরাপত্তার উদ্বেগ, সংসারের দায়িত্ব কিংবা কাছাকাছি উপযুক্ত চাকরির অভাব তাঁদের সামনে বাস্তবসম্মত বিকল্প খুব কমই রাখে।
এই পরিবর্তন নিয়ে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, ভারতের মহিলা শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধির পিছনে যে ধরনের কাজের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি, সেই কাজ থেকে আয় হয় খুব সামান্য। কারণ, এই কাজের প্রসার ঘটেছে নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার ফলে নয়, বরং প্রয়োজনের তাগিদে।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে ভারতীয় মহিলারা ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কিংবা পরিবারগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁদের প্রতি অন্যায় করছে। অধিকাংশ পরিবারই নিরাপত্তা, শিশুদের দেখাশোনা এবং আশপাশে কী ধরনের কাজ পাওয়া যাচ্ছে, সেই বাস্তব সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেই জীবন চালায়। কিন্তু যে পরিসংখ্যানকে অগ্রগতির সাফল্য হিসেবে উদযাপন করা হচ্ছে, তাকে চূড়ান্ত সাফল্য বলে ধরে নেওয়ার আগে আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কর্মরত মহিলাদের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কতজন পারিশ্রমিক পাচ্ছেন?
মহিলাদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধি পাওয়াই প্রমাণ করে না যে আরও বেশি মহিলা নিরাপদ, পারিশ্রমিকযুক্ত এবং সম্মানজনক কাজ পেয়েছেন। কখনও কখনও এর অর্থ শুধু এই যে, তাঁদের আগে থেকেই করে আসা অবৈতনিক কাজের একটা বড় অংশ শেষ পর্যন্ত পরিসংখ্যানে জায়গা পেয়েছে। এটাও এক ধরনের অগ্রগতি। কিন্তু শিরোনামে যে সাফল্যের ছবি তুলে ধরা হয়, তার তুলনায় এই অগ্রগতি অনেকটাই সীমিত এবং ভঙ্গুর।
পরের বার এই পরিসংখ্যানকে যখন সাফল্য হিসেবে উদযাপন করা হবে, তখন হাততালি দেওয়ার আগে আরও একটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন।
এখন যেসব মহিলাকে কর্মরত হিসেবে গণনা করা হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে কতজন সত্যিই নিজেদের কাজের জন্য পারিশ্রমিক পাচ্ছেন? কতজনের নিজের নামে সেই টাকা আসছে, আর কতজনের হাতেই বা সেই টাকা পৌঁছচ্ছে?
সূত্র: পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (PLFS), পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রক, ২০১৭-১৮ ও ২০২৩-২৪ সালের তুলনামূলক তথ্য; টাইম ইউজ সার্ভে ২০২৪, ভারত সরকারের পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রক; ভারতের মহিলা শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক প্রবণতা নিয়ে বেহানবক্স (BehanBox) এবং অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের CEDA-র বিশ্লেষণ।
