
কলকাতা: কেউ ভোর রাতেই স্বামীর ফোনটা পেয়েছিলেন, কেউ পাননি, লোকের মুখে খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন স্বামীর কর্মস্থলে। যতক্ষণে তাঁরা পৌঁছতে পারেন, ততক্ষণে স্বামীর ফোন বন্ধ! কোনওভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না তাঁদের সঙ্গে। চারদিকে পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া কালো কালো ছাই, কঙ্কাল বেরিয়ে আসা গোডাউন-কারখানার জিনিসপত্র, নাক ঝাঁঝিয়ে যাওয়া পোড়া গন্ধ, আর দমকল পুলিশ কর্মীদের ভিড়, পুলিশের ‘লাইন ডন্ট ক্রস’এর ফিতা! আর সেই ফিতের ওপারেই ওঁদের স্বজন! ১২ ঘণ্টা পেরিয়েছে। রাতে ১টায় আগুন লেগেছিল। এই প্রতিবেদন যখন লেখা হচ্ছে, সোমবার বেলা সাড়ে তিনটে নাগাদও সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
ভিতরে তিন জায়গায় তখন পকেট ফায়ার রয়েছে। আর যাঁরা ভিতরে ছিলেন, তাঁদের কোনও খোঁজ নেই। তিন জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। আর ২০ জনের নাম নিখোঁজের তালিকায়! তাঁরা কি আদৌ জীবিত রয়েছেন? পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া, ঝলসে যাওয়া গোডাউনের মধ্যে হাতড়েও তাঁদের হদিশ মেলেনি! দমকলকর্মীরাও এখনও কোনও সদুত্তর দিতে পারছেন না, একরাশ উৎকন্ঠায় পরিজনরা। স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বললেন, তা শিউরে ওঠার মতো।
আনন্দপুরের নাজিরাবাদের ওই গুদামটিতে মূলত শুকনো, প্যাকেটজাত খাবার মজুত করা থাকত। ছিল ঠান্ডা পানীয়ের বোতলও। দমকল আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, ওই এলাকায় মোট দুটো সংস্থা ছিল। একটি মোমো কারখানা, আর তার পাশে ডেকরেটর্সের গোডাউন-ওয়্যারহাউজ়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, রবিবার রাতে ওই গোডাউনেই পিকনিক ছিল। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, ২০ জন তো বটেই, অন্ততপক্ষে ৩০ জনের মতো ভিতরে থাকার কথা! সেরকমই একজন সুব্রত খাঁড়া। তাঁর এক আত্মীয় ওই ডেকরেটর্সের গোডাউনে কাজ করেন। সুব্রত খাঁড়া বললেন, “আমি যেতে পারিনি। আমার সম্বন্ধী গিয়েছিল দেখতে। ভিতরে ঢুকে দেখে, পুড়ে সব ছাই হয়ে গিয়েছে। মাথাগুলো পড়ে রয়েছে লাইন দিয়ে। বলছে সবাই ৩০ জন ছিল ভিতরে। দমকল কর্মীদের আগে ওরা গিয়েছিল। ওরা তো এখানে কাজ করত, তাই রাস্তা চিনত। ওরাই পিছনের রাস্তা দিয়ে গিয়েছিল।”
যখন তিনি একথা বলছেন, তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন এক দাদা! তাঁর ভাই, নাম পঙ্কজ হালদার। তিনি সেখানে কাজ করেন। রাতে ডিউটি ছিল। ভোর রাতে তাঁর ভাই নিজেই ফোন করে স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন, আগুন লেগেছে… ফোন পেয়ে ভাই-বউকে নিয়ে চলে আসেন তিনি। কিন্তু ভাইয়ের কোনও খোঁজ নেই। বললেন, “বাইকটা বাইরে পড়ে রয়েছে। ভাই বৌমাকে ফোন করেছিল। এসে বাইকটা দেখতে পেলাম, ভাইকে এখনও দেখিনি। স্যরদের (দমকল আধিকারিক) জিজ্ঞাসা করলাম, বলছেন, কিছু জানাতে পারছি না এখনই।”
বাইরে তখন বছর পঁচিশ-তিরিশের দুই মহিলা প্রায় অচৈতন্য হয়ে পড়েছেন, স্বামীর কথা ভেবে দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে তাঁদের। খোঁজ নেই, আদৌ খোঁজ মিলবে কিনা, সেই অনিশ্চয়তা তাড়া করে ফিরছে… যখনই জ্ঞান ফিরছে বুক ফাটা কান্না! গুদামের এক কর্মী বলেন, ‘‘শেষ বার ওদের সঙ্গে যখন কথা হয়েছে, ওরা বলেছিল দেওয়াল ভেঙে বেরোনোর চেষ্টা করছে। তার পর আর যোগাযোগ করা যায়নি।’’
সোমবার বেলা সাড়ে পর্যন্ত তিন জনের দেহ উদ্ধার ছাড়া আর বাকিদের কোনও খোঁজ নেই। কারখানার ভিতরে ঝলসে যাওয়া সবকিছুর ভিড়ে তা খুঁজে পাওয়াও এখন দমকলকর্মীদের কাছে চ্যালেঞ্জ। নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।