
নন্দিনী চক্রবর্তী, জগদীশপ্রসাদ মীনা, সুপ্রতীম সরকার, পীযুষ পাণ্ডে, বিনীত গোয়েল একের পর এক আইএএস, আইপিএস সরিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটের আবহে এর আগে শেষ কবে এভাবে সোজা মুখ্যসচিব বদল হয়েছে তা মনে করতে পারছেন না কেউই। কিন্তু কেন এই পদক্ষেপ নির্বাচন কমিশনের? ভোট ঘোষণার দিন মানে ওই ১৫ মার্চের পর থেকেই নবান্ন থেকে জেলা প্রশাসন সর্বত্রই ব্যাপক রদবদল। অনেকের শুধু জায়গা বদল করেই ক্ষান্ত থাকেনি কমিশন। একেবারে ভিন রাজ্যে পর্যবেক্ষক করেও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফুঁসছেন মমতা। কমিশনের রদবদলের এই অধিকারই নেই। বলছেন বর্ষীয়ান আইনজীবী তথা শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্য়ায়। দ্বারস্থ হয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের। কিন্তু বিতর্ক-চাপানউতোরের আবহে ফুটছে বঙ্গ রাজনীতির আঙিনা।
ভোট ঘোষণার পরেই মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, রাজ্য পুলিশের ডিজি-সহ রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষস্তরে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। বদলি করা হয়েছে একাধিক জেলাশাসক, ডিইও, পুলিশ সুপার এবং পুলিশ কমিশনারদের। এখানেই শেষ নয়, খাদ্য এবং পিডব্লিউডি-র মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরের প্রধান সচিবদের মতো সিনিয়র অফিসারদের ভোটের পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে পাঠানো হয়েছে। গোটা দেশে বাংলার সঙ্গেই আরও ৫ রাজ্যে ভোট হলেও অন্যান্য রাজ্যে এমন ব্যাপক রদবদলের ছবি খুব একটা চোখে পড়ছে না। কিন্তু কেন শুধুই বাংলা?
কেন বাংলাতেই এই ব্যাপক রদবদল?
কমিশনের মূল লক্ষ্য একটাই—ভয়মুক্ত এবং অবাধ নির্বাচন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বারবার এই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। তাঁর সাফ কথা, যে কোনও মূল্যে রাজ্যে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এর প্রধান কারণ পশ্চিমবঙ্গের ভোট-হিংসার অতীত ইতিহাস। আগের বিধানসভা নির্বাচন থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত ভোট, একুশের হাইভোল্টেজ নির্বাচন, এমনকী উপনির্বাচন বা সমবায় নির্বাচনেও রাজ্যে ব্যাপক হিংসার ছবি দেখা গিয়েছে, ঝরেছে রক্ত, গিয়েছে প্রাণ। কমিশন এবার সেই কলঙ্কিত ছবিটাই আমূল বদলে ফেলতে চাইছে। এই মুহূর্তে কমিশনের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল বাংলায় একটি সম্পূর্ণ ‘হিংসামুক্ত’ নির্বাচন করানো।
অনেকেই বলছেন, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার যদি দেখাতে পারেন যে এবার ভোটে একটিও প্রাণহানি হয়নি, তবে সেটাই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, জ্ঞানেশ কুমার কি এই কারণেই অতিসাবধানী হয়ে উঠছেন? তিনি কি ভোটের সম্পূর্ণ রাশ নিজের হাতেই রাখতে চাইছেন? সে কারণেই কী এমন ব্যাপক রদবদল? বিরোধীদের ইঙ্গিতটা কিন্তু সেদিকেই। অতীত মনে করাচ্ছেন দিলীপ ঘোষ। মনে করাচ্ছেন ভোট-বঙ্গের অতীতের হিংসার কথা।
কী বলছে বিরোধীরা?
বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী তো প্রতি মুহূর্তে রাজ্য সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ভয়মুক্ত নির্বাচনের দাবি তুলছেন। রাজ্যে অবাধ ভোট করতে কমিশন ঠিক কতদূর যেতে পারে, সেটাই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে পদ্ম শিবির। রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিজেপি নেতারা বারবার রাজ্যে ‘রাষ্ট্রপতি শাসনের’ পক্ষেও সওয়াল করছেন। যদিও তৃণমূল বলছে, আসলে তলে তলে ওটাই তাঁরা অনেকদিন থেকে চেয়ে আসছে। সুকান্ত মজুমদার যদিও বলছেন, নির্বাচন কমিশন নিজের ক্ষমতাতেই বলীয়ান।
কী বলছে তৃণমূল?
বিশ্লেষকদের মতে, আদর্শ আচরণবিধি লাগু হয়ে যাওয়ার পর প্রশাসনিক নিয়মে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মুহূর্তে সরাসরি কিছু করার নেই। কিন্তু তিনি নীরবও নেই। দফায় দফায় নির্বাচন কমিশনে চিঠি পাঠিয়ে তিনি কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছেন। শুরুটা যদিও সেই এসআইআরের সময় থেকেই বয়েছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে ক্ষোভ উগরে দিয়ে এই পরিস্থিতিকে তিনি সরাসরি ‘জরুরি অবস্থা’-র সঙ্গে তুলনা করেছেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, কমিশনকে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় স্তরে বিরোধী দলগুলোকে এক ছাতার তলায় আনার চেষ্টাও চালাচ্ছেন মমতা। সেই ওষুধে কাজও হচ্ছে। ইতিমধ্যে অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং ওমর আবদুল্লার মতো সর্বভারতীয় স্তরের নেতারা কমিশনের এই ‘আগ্রাসী’ ভূমিকার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। অর্থাৎ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রতিবাদের রেশ শুধুমাত্র রাজ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় স্তরেও পৌঁছে দিতেও সচেষ্ট হয়েছেন। তাহলে কী এখন থেকেই ২৯ এর ঘুঁটিটা অল্প হলেও সাজিয়ে রাখতে চাইছেন মমতা? বেনজির আক্রমণ শানাচ্ছেন নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে।
সোজা কথায় কমিশনের এই ‘অতিসক্রিয়তা’ একদিকে যেমন শাসকদলের কাছে গণতান্ত্রিক অধিকারে হস্তক্ষেপ ও ‘জরুরি অবস্থা’র নামান্তর, অন্যদিকে বিরোধীদের কাছে তা অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের একমাত্র আশা। তবে রাজনীতির এই প্রবল চাপানউতোরের ঊর্ধ্বে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের কাছে এখন সবথেকে বড় প্রশ্ন—এই প্রশাসনিক রদবদল কি আক্ষরিক অর্থেই বুথমুখী সাধারণ ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে? নজিরবিহীন এই রদবদল বাংলার ভোট-মানচিত্র থেকে ‘হিংসা’ শব্দটিকে মুছে ফেলতে পারবে? নজর শুধু বঙ্গবাসীর নয়, নজর গোটা দেশের।