History of Kolkata and Place: এসপ্ল্যানেডের আরেক নাম ধর্মতলা কেন জানেন?
সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকেই কলকাতার হৃদপিণ্ড বা ‘জিরো পয়েন্ট’ হিসেবে পরিচিত যে অঞ্চলটি, তাকে আমরা একাধারে ‘এসপ্লেনেড’ বলি, আবার ‘ধর্মতলা’ বলেও ডাকি। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, সাহেবদের দেওয়া ‘এসপ্লেনেড’ কীভাবে আপামর বাঙালির মুখে ‘ধর্মতলা’ হয়ে উঠল? এই নামকরণের পেছনে জড়িয়ে আছে এক মিশ্র সংস্কৃতির ইতিহাস।

কলকাতার অলিতে-গলিতে লুকিয়ে রয়েছে ইতিহাসের অজস্র পরত। এখানকার এক-একটি মোড়, এক-একটি অঞ্চলের নামের পেছনে জড়িয়ে আছে শতবর্ষ প্রাচীন বিবর্তনের আখ্যান। সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকেই কলকাতার হৃদপিণ্ড বা ‘জিরো পয়েন্ট’ হিসেবে পরিচিত যে অঞ্চলটি, তাকে আমরা একাধারে ‘এসপ্লেনেড’ বলি, আবার ‘ধর্মতলা’ বলেও ডাকি। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, সাহেবদের দেওয়া ‘এসপ্লেনেড’ কীভাবে আপামর বাঙালির মুখে ‘ধর্মতলা’ হয়ে উঠল? এই নামকরণের পেছনে জড়িয়ে আছে এক মিশ্র সংস্কৃতির ইতিহাস।
ইংরেজি ‘এসপ্লেনেড’ (Esplanade) শব্দটির সাধারণ অর্থ হল কোনও জলাশয় বা দুর্গের ধারে উন্মুক্ত সমতল স্থান। পুরনো কলকাতার মানচিত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, বর্তমানের রাজভবন থেকে ময়দান ও গঙ্গার তীর পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলটি একসময় ওল্ড ফোর্ট উইলিয়ামের সামনে একটি বিশাল ফাঁকা মাঠ ছিল। ইংরেজরা তাদের প্রতিরক্ষার খাতিরে এই অঞ্চলকে জঙ্গলমুক্ত করে উন্মুক্ত রাখতে চেয়েছিল। লর্ড ওয়েলেসলির আমলে এখানে গভর্নমেন্ট হাউস বা রাজভবন তৈরি হওয়ার পর এই চত্বরের গুরুত্ব আরও বাড়ে এবং সাহেবদের মুখে এর নাম পাকা হয়ে যায় ‘এসপ্লেনেড’।
কিন্তু এই সাহেব-পাড়ার সমান্তরালেই বহমান ছিল সাধারণ মানুষের কলকাতা। সাহেবদের ‘এসপ্লেনেড’-এর পূর্ব প্রান্তটিকে এদেশীয় মানুষ ডাকতে শুরু করল ‘ধর্মতলা’। কেন এই নাম? এই নিয়ে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে মূলত দুটি প্রধান মত রয়েছে।
প্রথম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় মতটি জড়িয়ে আছে বাংলার লৌকিক দেবতা ‘ধর্মঠাকুর’-এর উপাসনার সঙ্গে। আদি কলকাতায় এই অঞ্চলে একটি প্রাচীন ধর্মঠাকুরের মন্দির ছিল। তৎকালীন অন্ত্যজ ও সাধারণ নিম্নবর্গীয় মানুষের অন্যতম প্রধান উপাসনাস্থল ছিল এই মন্দিরটি। সেই ‘ধর্মঠাকুরের তলা’ বা স্থান থেকেই কালক্রমে অঞ্চলটির নাম হয় ‘ধর্মতলা’। ইতিহাসবিদ রেভারেন্ড জেমস লং-এর লেখাতেও এই তথ্যের সমর্থন মেলে। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা এবং পুণ্যার্থীদের যাতায়াতের কারণেই স্থানটি ‘ধর্মতলা’ নামে পরিচিতি পায়।
দ্বিতীয় মতটি অবশ্য একটু ভিন্ন এবং তা জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার মিশ্র সংস্কৃতির আদি পর্বের সঙ্গে। কোনও কোনও গবেষকের মতে, অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে এই অঞ্চলে ‘ধর্ম’ নামের এক বিখ্যাত বৌদ্ধ পণ্ডিত বা সন্ন্যাসী বাস করতেন। আবার অনেকের মতে, এই চত্বরে একটি প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপ বা বিহার ছিল, যেখানে ‘বৌদ্ধ ধর্ম’ চর্চা হতো। সেই বৌদ্ধ ধর্মের ‘ধর্ম’ শব্দ থেকেই এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছিল। পরবর্তীতে অবশ্য এই চত্বরেই মহীশূরের টিপু সুলতানের পুত্র শাহজাদা গোলাম মহম্মদ বিখ্যাত ‘টিপু সুলতান মসজিদ’ নির্মাণ করেন, যা আজও এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ল্যান্ডমার্ক। অর্থাৎ, নামের উৎস যা-ই হোক না কেন, এই অঞ্চলটি যে বহু ধর্মের মানুষের এক মিলনক্ষেত্র ছিল, তা বলাই বাহুল্য।
সময়ের নিয়মে কলকাতার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক মানচিত্র বদলেছে। ট্রাম-বাসের যুগ পেরিয়ে কলকাতা আজ দ্রুতগতির মেট্রোর যুগে প্রবেশ করেছে। বাম আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত কলকাতার বহু রাস্তা ও অঞ্চলের ঔপনিবেশিক নাম বদলে দেশীয়করণের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু এসপ্লেনেড এবং ধর্মতলা— এই দুটি নাম কোনও সরকারি ডিক্রি ছাড়াই গত আড়াইশো বছর ধরে পাশাপাশি টিকে রয়েছে।
