History of Kolkata: সম্রাট অশোকের সঙ্গে রয়েছে যোগ, প্রিন্সেপ ঘাটের নাম এল কোথা থেকে জানেন?
Kolkata Princep Ghat History: সেলফির ফ্রেমে বন্দি হয় বিদ্যাসাগর সেতুর ব্যাকড্রপ। কিন্তু উৎসবের এই চেনা কোলাহলের আড়ালে, প্রতিদিন যে হাজার হাজার মানুষ এই ঘাটের সিঁড়িতে পা রাখছেন, তাঁদের ক’জন জানেন কার স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছিল এই ঐতিহাসিক সৌধ? কার নামে নামাঙ্কিত এই ঘাট?

কলকাতা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা গ্রিক-গথিক স্থাপত্যের সেই চেনা স্তম্ভগুলো— প্রিন্সেপ ঘাট। বিকেল নামলেই যেখানে ভিড় করেন যুগলরা, মাঝনদীতে নৌকোভ্রমণের আনন্দ নেন পর্যটকেরা, আর সেলফির ফ্রেমে বন্দি হয় বিদ্যাসাগর সেতুর ব্যাকড্রপ। কিন্তু উৎসবের এই চেনা কোলাহলের আড়ালে, প্রতিদিন যে হাজার হাজার মানুষ এই ঘাটের সিঁড়িতে পা রাখছেন, তাঁদের ক’জন জানেন কার স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়েছিল এই ঐতিহাসিক সৌধ? কার নামে নামাঙ্কিত এই ঘাট?
১৮৪১ সালে যখন এই ঘাট তৈরি হয়, তখন এর নামকরণ করা হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক অনন্য রাজপুরুষ জেমস প্রিন্সেপের (James Prinsep) নামে। তবে জেমস প্রিন্সেপ কোনও সাধারণ ঔপনিবেশিক শাসক বা শোষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একাধারে প্রাচ্যবিদ, বিজ্ঞানী, রসায়নবিদ এবং ভাষাতাত্ত্বিক। ভারতের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করার পেছনে এই ব্রিটিশ ভদ্রলোকের অবদান এতটাই গভীর যে, আজ আমরা যে গৌরবময় প্রাচীন ভারতকে চিনি, তার অনেকটাই প্রিন্সেপের কাছে ঋণী।
জেমস প্রিন্সেপের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক কীর্তি হল সম্রাট অশোকের শিলালিপির পাঠোদ্ধার করা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা পাথরের স্তম্ভ এবং পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা এক রহস্যময় লিপি ভারতের ইতিহাসবিদদের ভাবিয়ে তুলেছিল। কেউ তার অর্থ উদ্ধার করতে পারেননি। ১৮৩৭ সালে জেমস প্রিন্সেপ তীব্র অধ্যবসায়ের মাধ্যমে প্রাচীন ‘ব্রাহ্মী’ ও ‘খরোষ্ঠী’ লিপির পাঠোদ্ধার করেন। তাঁর এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলেই উন্মোচিত হয় এক মহান সম্রাটের ইতিহাস, যাঁর নাম ‘দেবনামপ্রিয় প্রিয়দাসী’ বা সম্রাট অশোক। প্রিন্সেপ যদি এই লিপির রহস্যভেদ না করতেন, তবে ভারতের ইতিহাস থেকে মৌর্য বংশ তথা অশোকের সুবর্ণ অধ্যায় হয়ত চিরতরে হারিয়ে যেত।
মাত্র ২০ বছর বয়সে (১৮১৯ সালে) জেমস প্রিন্সেপ কলকাতায় এসেছিলেন ‘ক্যালকাটা মিন্ট’ বা টাকশালের অ্যাসিস্ট্যান্ট মাস্টার হিসেবে। পরবর্তীকালে তিনি ‘এশিয়াটিক সোসাইটি’-র সম্পাদক হন। শুধু প্রাচীন লিপি নয়, কলকাতার আধুনিকায়নেও তাঁর অবদান ভোলার নয়। কলকাতার আধুনিক পরিমাপ, মানচিত্র তৈরি এবং শহরের জলনিকাশি ব্যবস্থার প্রাথমিক রূপরেখা তৈরিতে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। হুগলি নদীর নাব্যতা এবং জোয়ার-ভাটার প্রথম বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করেছিলেন তিনি।
মাত্র ৪০ বছর বয়সে, ১৮৪০ সালে অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে লন্ডনে মারা যান এই ক্ষণজন্মা পন্ডিত। তাঁর মৃত্যুর পর কলকাতার কৃতজ্ঞ নাগরিক সমাজ চাঁদা তুলে ডব্লিউ ফিৎজেরাল্ডের নকশায় এই দৃষ্টিনন্দন ঘাটটি তৈরি করেন। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রিন্সেপ ঘাট কেবলই একটি ‘পিকনিক স্পট’ বা সোশ্যাল মিডিয়ার ‘রিল’ বানানোর ব্যাকগ্রাউন্ডে পরিণত হয়েছে। ইতিহাসের এই উদাসীনতা দুঃখজনক। সম্পাদকীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, যে মানুষটি ভারতের হারিয়ে যাওয়া গৌরবকে মাটির নিচ থেকে তুলে এনে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আজ তাঁর নামাঙ্কিত সৌধটি স্রেফ বিনোদনের আলোয় ঝলমল করে, কিন্তু তাঁর মেধা ও অবদানের কথা বিস্মৃতির অন্ধকারে ঢাকা পড়ে থাকে।
প্রিন্সেপ ঘাটের সৌন্দর্যায়ন অবশ্যই প্রয়োজনীয়, তবে তার চেয়েও বেশি জরুরি সেখানে আসা নতুন প্রজন্মের কাছে জেমস প্রিন্সেপের ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডকে তুলে ধরা। স্থাপত্যের রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি যদি সেখানে একটি ছোট তথ্যকেন্দ্র বা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা যেত, তবেই হয়ত এই মহান প্রাচ্যবিদের প্রতি কলকাতার আসল শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব হতো। শুধু স্থাপত্যের কাঠামো নয়, ইতিহাসের চেতনাকেও বাঁচিয়ে রাখা দরকার।
