
কলকাতা: বন্ধু-বিয়োগ! গত ২৪ ঘণ্টায় তাঁর সাক্ষাৎ অনেকেই পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেভাবে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলতে চাননি তিনি। তিনিও কি বন্ধুর পথেই পা বাড়িয়ে রয়েছেন? গত তিন-চার দিনে প্রতীক-উর পর্বে এ জল্পনাও উল্কাগতিতে ছড়িয়েছে। প্রতীক-উরের তৃণমূলে যোগ দেওয়ার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়েছে। বন্ধুকে বোঝানো তাঁর সমস্ত চেষ্টা-প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে, তাঁর কথামতো ব্যর্থ হয়েছে ‘বন্ধুত্বও’, মনের ভিতর দু’দিন ধরে চলা উথালপাতাল এখন শান্ত হয়েছে, তাই খানিকটা মনের কথা বলতে পারলেন, সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন সিপিএমের আরেক তরুণ নেতা সৃজন ভট্টাচার্য। প্রতীক-উরের চলে যাওয়া নিয়ে বললেন বটে, তবে তাঁর গলায়, তাঁর বলা প্রতিটি শব্দে ধরা পড়ল কষ্ট, বন্ধুকে ধরে না রাখতে পারার আক্ষেপ, ‘ব্যর্থ’ বন্ধু হওয়ার দুঃখ! প্রতীক-উরের বিরুদ্ধে একটিও আক্রমণাত্মক শব্দ শোনা গেল না তাঁর মুখে, বরং তাঁর প্রতিটা শব্দচয়নে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করলেন সিপিএমের তরুণ নেতারা এখনও তাঁদের আদর্শে অটুট রয়েছেন।
তিনি বললেন, “আমি তো এতদিন একরকমভাবে চিনি এসেছি ওকে। রাতারাতি তেড়ে গালাগাল করার মতো প্রফেশনাল এখনও হয়ে উঠতে পারিনি। মনের মধ্যে, মাথায় অনেক রকম জিনিস ঘুরছে। এখন কিছুটা থিতু হয়েছে।” প্রতীক-উর দলের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। কিন্তু দল যে তাঁকে রাখার জন্য সব রকমের চেষ্টা করেছে, তা এদিনও বললেন সৃজন। বললেন, “শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমাদের পার্টি নেতৃত্ব, আমি ধরে রাখার চেষ্টা করেছি। খানিকটা নজিরবিহীনভাবেই রাজ্য সম্পাদককে এত কথা বলার পরও রাজ্য কমিটির বৈঠকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বিমান দা ফোন করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত আমাদের দলও চেয়েছিল, কী মান অভিমান রয়েছে, মিটিয়ে নিতে। শেষমেশ বুঝলাম, ও সিদ্ধান্ত নিয়েই নিয়েছে।” তখনই সৃজনের গলায় সেই এক রাশ গ্লানি।
বন্ধুর চিন্তাভাবনা ধরতে পারেননি? প্রশ্নটা করতেই বললেন, “বন্ধু হিসাবে আমার ব্যর্থতাও হতে পারে। কেন শুনল না! আমি তো ওকেও চিনি। একেবারেই দায়িত্বজ্ঞানহীন-হঠকারী সিদ্ধান্ত। দূরটা দেখল না, হয়তো ইমিডিয়েট কোনও লাভ ক্ষতি দেখেছে। আমার ধারণা পস্তাবে। আমার ধারণা বেশি দিন লাগবে না, বাড়ি ফিরে আফসোস করবে, এটা কেন করলাম।”
দলের প্রতি বন্ধুর ক্ষোভকে মান্যতা দিয়েছেন সৃজন, কিন্তু তাঁর তৃণমূলে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সেই মান্যতাকে মিথ্যা করে দিয়েছে, সেটাও বললেন। তাঁর কথায়, “প্রায় জেদ করে সব বাঁধন ছিন্ন করে বেরিয়ে যাওয়া, এই রাগগুলোর মানে থাকত, যদি ও তৃণমূলের পতাকাটা হাতে না নিয়ে নিত। একবার তৃণমূলে জয়েন করে গেল মানে, এখন মনে হচ্ছে, মনে হবে, তৃণমূলে জয়েন করার উদ্দেশ্য ছিল। সেই পথ প্রশস্ত করতেই এতগুলো কথা বলেছে।”
সিপিএমের তরুণ প্রজন্ম আদর্শ বদলাবে না, এটা সূর্য পূর্ব দিকে ওঠার মতো চিরন্তন সত্য! কিন্তু সেই চিন্তাভাবনায় কিছুটা ভাঙন ধরেছে প্রতীক উরের পদক্ষেপে? প্রশ্নটা রাখা হয়েছিল সৃজনের কাছে। বললেন, “সত্যিই একজন চলে গিয়েছে, অস্বীকার করব কী করে! কিন্তু যারা এটার ওপর দাঁড়িয়ে একটা সরলীকরণের জায়গায় চলে যাবেন, তাদের উদ্দেশে বলব, তাজমহলও তো ভেঙে যেতে পারে, তার মানে মানুষ প্রেম করা বন্ধ করে দেবে, তা নয়। লক্ষ লক্ষ ছেলেমেয়ে গত কয়েক বছরে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।” প্রতীক উরের চলে যাওয়াটা হয়তো সৃজনদের আরও ঐক্যবব্ধ করে দিয়ে গেল- এই বার্তা দিয়েই শেষ করলেন সৃজন!