
দুয়ারে ভোট, দুয়ারে বেকার ভাতা। রাজ্য সরকার যদিও বলছে যুবসাথী। আগে যুবশ্রী ছিল এবার যুবসাথী। মাধ্যমিক পাশ কিন্তু এখনও কর্মহীন যুবদের পাশে দাঁড়াতেই ভাতা দিচ্ছে সরকার। ঘোষণা এবারের বাজেটে। বাজেট তো প্রতিবারই হয়, কিন্তু এবারের বাজেট তার ছন্দেই অনন্য। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটের আগে রাজ্য সরকারের শেষ বাজেট বা বলা ভাল ভোট অন বাজেট। আর তাতে যে চমক থাকে তা আগে থেকেই টের পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু চমকটা কোন পথে আসবে তা বোঝা যাচ্ছিল না। অবশেষে আশা কর্মী থেকে সিভিক পুলিশ, সকলের ভাতা বাড়ল, সঙ্গে হয়ে গেল বড় ঘোষণা। ১ অগস্ট থেকে চালু হবে এই যুবসাথী। রাতারাতি আবার দিনক্ষণও এগিয়ে এল। তাও আবার ৪ মাস। ১ এপ্রিল থেকেই বেকার যুবদের অ্যাকাউন্টে ঢুকবে টাকা। ২৯৪টি বিধানসভা ক্ষেত্রেই বসেছে ফর্ম ফিলাপের ক্যাম্প। থিকথিক করছে ভিড়। ভাতার লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকেই বলছেন চাকরির কথা, চাইছেন স্থায়ী চাকরি।
ভোটের মুখে এই প্রকল্প চালু করায় তা নিয়ে চর্চার অন্ত নেই। এখনও পর্যন্ত যা খবর তাতে দেখা যাচ্ছে গোটা রাজ্যে প্রায় ১৮ লাখের কাছাকাছি আবেদন জমা পড়েছে। বিরোধীরা বলছে শিল্প-কর্মসংস্থান না দিতে পেরে আসলে ভাতার ললিপপ দিচ্ছে সরকার। এখন দিনের শেষে লাভের গুড় ঘরে তুলতে পারবে তো তৃণমূল?
তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এই প্রকল্প একটি বড় মাস্টারস্ট্রোক হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। মূল টার্গেট জেন জ়ি। রাজ্যে কয়েক লক্ষ তরুণ ভোটার রয়েছেন যারা প্রথম বা দ্বিতীয়বার ভোট দেবেন। এই ‘বেকার ভাতা’ প্রকল্পের মাধ্যমে সেই বিশাল যুব ভোটব্যাঙ্ককে নিজেদের দিকে টানতে চাইছে ঘাসফুল শিবির।
অন্যদিকে বাংলার তরুণী, মধ্যবয়স্ক মহিলা, বয়স্ক মহিলা সকলের জন্যই রয়েছে গুচ্ছ গুচ্ছ প্রকল্প। পুরোদমে চলছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী, বিধবা ভাতার মতো প্রকল্প। বিশ্লেষকরা বলছেন ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ যেমন আগের ভোটগুলিতে শাসকদলকে ব্যাপক ডিভিডেন্ড দিয়েছিল তেমনই এবার যুবসাথীর মাধ্যমে যুবক-যুবতীদের মধ্যেও সেই একই ধরনের প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও সরকারের মতে, এটি কেবল ভাতা নয়, বরং কর্মসংস্থান খোঁজার পথে তরুণদের জন্য একটা ছোট্ট আর্থিক নিরাপত্তা দেওয়ার চেষ্টা। তৃণমূল নেতাদেরও সুর তেমনই। কিন্তু ভোটের মুখেই কেন? এতদিন বেকার যুবদের কথা মাথায় আসেনি? ঠিক ভোটের মুখেই চালু করতে হল। বিজেপির দাবি, গত ১৫ বছরে রাজ্যে কোনো বড় শিল্প বা কর্মসংস্থান হয়নি বলেই শিক্ষিত যুবকদের ১৫০০ টাকার ভাতার লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। আসলে ভাতা দিয়ে ভোট কিনতে চাইছে তৃণমূল। বেকার ছেলেমেয়েদের ওয়কাৎ কী শুধু দেড় হাজার? প্রশ্ন তুলছে গেরুয়া শিবির।
বিজেপি নেতা সজল ঘোষ তৃণমূলের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে বলছেন, “এরা শিক্ষিত বেকারদের গালে থাপ্পর মেরে বুঝিয়ে দিচ্ছে এই রাজ্যে থাকলে তোমার ওয়কাৎ দেড় হাজার টাকা। আমি বেকার ভাইদের বলব আপনারা ভাতাটা নিন, কিন্তু ভোটটা ভুলেও দেবেন না।” সজল আবার বলছেন তিনি তাঁর ছেলেকেও বলেছেন টাকা নিতে।
কটাক্ষের সুর বাম ও কংগ্রেসেরও। বামেরা বলছে তাঁদের সময়েও তাঁরাও বেকার ভাতা দিত। কিন্তু এভাবে তা নিয়ে রাজনীতি করতো না। কংগ্রেসের দাবি, পায়ের তলার মাটি সরকেই দান-খয়রাতির রাজনীতি করে টিকে থাকতে চাইছে তৃণমূল। বাম কংগ্রেস নেতাদের সাফ কথা, ১৫০০ টাকা কোনও সমাধান নয়। যুবকদের দরকার স্থায়ী কাজ। রাজ্যের চাই শিল্প।
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী বলছেন, “এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে এই ভাতা আসলে ভোটের জন্য চালু করা হয়েছে। যে সরকার বলেছিল ডবল ডবল চাকরি দেব তার এখন সিঙ্গেল চাকরি দেওয়ারও ক্ষমতা নেই, তাই ভাতা।” কটাক্ষের সুর প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরীর গলাতেও। মমতার বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে তিনি বলছেন, “উনি প্রমাণ করে দিয়েছেন রুটি-রুজির প্রশ্নে এ বাংলায় তিনি গত ১৫ বছর কিছুই করেননি। বাংলায় বেকার যুবকের সংখ্যা দিনের পর দিন হু হু করে বেড়ে চলেছে।”
সাম্প্রতিককালে নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে বারবার উত্তাল হয়েছে রাজ্য-রাজনীতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতেই যুবদের ক্ষোভের পাহাড় জমেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। এমতাবস্থায় গ্রামীণ ও নিম্নবিত্ত যুবকদের সমর্থন পেতে বদ্ধপরিকর শাসকদল। কারণ, প্রতিভোটেই দেখা যায় শহুরে ভোটাররা কিছুটা মুখ ফেরালেও গ্রামীণ ভোট ব্যাঙ্ক অটুট থেকে তৃণমূলের। অন্যদিকে বাড়তে থাকা বেকারত্বের মধ্যে শহুরে ও উচ্চশিক্ষিত বেকারদের ক্ষোভকেও কিছুটা স্থিমিত করার চেষ্টা হতে পারে এই প্রকল্পের হাত ধরে। অন্যদিকে বিরোধীরা ভাতার বিরোধী করলেও তার সুর যেন কিছুটা নরম। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তীব্রভাবে ভাতার বিরোধিতা করলে ‘গরিব বিরোধী’ তকমা পাওয়ার ভয় থাকছেই। ফলে উপায় নেই। এদিকে এরইমধ্যে তো আবার বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন তাঁরা ক্ষমতায় এলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের দেড় হাজার বেড়ে একেবারে তিন হাজার হয়ে যাবে। তাহলে বুঝতেই পারছেন।
গত বছরের শেষেই হয়েছে বিহারের বিধানসভা নির্বাচন। সেখানেও ভোটের আগে মহিলাদের অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিল একেবারে ১০ হাজার টাকা। মহিলা রোজগার যোজনা নিয়ে শুধু বিহারের রাজনৈতিক মহল নয়, তোলপাড় চলেছিল গোটা দেশেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের ঠিক আগে টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হলে তার ছাপ অনেকটাই তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক শক্ত করতে কাজে লাগবে। কিন্তু বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ যদিও বলছেন, ছেলের বেকার ভাতার লাইনে যেভাবে বাবাদের দাঁড়াতে হচ্ছে এর থেকে দুর্ভাগ্যের ছবি বাংলার জন্য আর হতে পারে না। তার মতে দিনের শেষে আবেদনকারীর সংখ্যা কোটিও পার করে যেতে পারে।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও কিন্তু এ নিয়ে আসছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন এ ভিক্ষা দেওয়ার সামিল, কেউ বলছেন সবই ভোটের জেতার অস্ত্র। ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে লক্ষ্মী ভান্ডারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মমতা। সেই লক্ষ্মী ভান্ডারের উপর ভর করে পঞ্চায়েত নির্বাচন, লোকসভা নির্বাচনে ফসল ঘরে তুলেছে তৃণমূল। অর্থাৎ লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রমাণ করে দিয়েছে ভাতা দিয়ে নির্বাচনে জেতা যায়। শুধু বাংলা নয়, দিল্লি, মধ্য প্রদেশ, ওড়িশা বা সম্প্রতি বিহার নির্বাচনেও প্রমাণ হয়েছে। আর লক্ষ্মীর ভান্ডারের সঙ্গে অর্থাৎ ঘরের মেয়েদের সঙ্গে যদি ছেলেদেরও টাকা দেওয়া যায়, তাহলে কী হবে? দেখা যাক ভোটের রেজাল্ট কী বলে।