
কিলোমিটারের পর কিলোমিটার জুড়ে শুধু সাদা টুপি। সাদা ফতুয়া। পায়ে চটি, বুট। হেঁটে চলেছেন লাখ লাখ মানুষ। প্রশাসনের হিসাবের বাইরে চলে গিয়েছে ভিড়। লক্ষ মানুষের লক্ষ সমাগম সহকারে মুসলিমদের ধর্ম সম্মেলন বিশ্ব ইজতেমা শেষ হয়েছে গত ৫ জানুয়ারি। দুর্গাপুর একপ্রেসওয়ের পর দাদপুর এলাকায় রয়েছে মহেশ্বরপুর। সেখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার এগিয়ে গেলেই চোখে পড়বে ৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে তৈরি হয়েছে ইজতেমা ময়দান। এই ‘ইজতেমা’ আসলে কী? কেন এত মানুষ ভিড় জমিয়েছিলেন সেখানে? তাৎপর্য কী এহেন ধর্ম সম্মেলনের?
ইজতেমা শব্দটি আরবি ‘ইজতিমা’ (اجتماع) থেকে এসেছে, যার অর্থ সমবেত হওয়া, একত্রিত হওয়া বা জমায়েত। ইসলামিক পরিভাষায় ইজতেমা বলতে বোঝানো হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মুসলমানদের একটি বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ, যেখানে দ্বীন, ঈমান, আমল ও আখলাক নিয়ে আলোচনা, নসিহত ও তালিম দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ হিসেবে পরিচিত তাবলিগ জামাতের ইজতেমা মূলত এই ধারণার ওপরই প্রতিষ্ঠিত।
ইসলামে ‘জামাত’ বা সমবেত ইবাদতের (উপাসনা) গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম ধর্মের গ্রন্থ কোরানের বক্তব্য অনুযায়ী, “তোমরা সবাই আল্লাহর সঙ্গে দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত থেকো এবং পরস্পরের থেকে আলাদা হয়ে যেও না” (সূরা আলে ইমরান: ১০৩)। এই আয়াত মুসলিম উম্মাহকে ধর্মীয় ঐক্যের দিকে আহ্বান জানায়। ইজতেমা সেই ঐক্যেরই বাস্তব প্রতিফলন, যেখানে বর্ণ, ভাষা, দেশ বা সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য ভুলে মুসলমানরা এক কাতার অর্থাৎ একটি লাইনে দাঁড়ায়।
ইজতেমার মূল উদ্দেশ্য হলো ঈমানের মজবুতি, সুন্নাহর অনুসরণ এবং দ্বীনের দাওয়াত। এখানে আলেম ও দাঈগণ তাকওয়া, তাওবা, ইখলাস, নামাজ, জিকির, কুরআন তিলাওয়াত এবং আখিরাতের জবাবদিহি নিয়ে ‘বয়ান’ (ধর্মীয় ভাষণ) প্রদান করেন। অংশগ্রহণকারীদের আত্মশুদ্ধি বা তাযকিয়াতুন নাফসের দিকে আহ্বান জানানো হয়, যাতে তারা এই জাগতিক দুনিয়ার মোহ থেকে বের হয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে মনোযোগী হতে পারেন।
ইজতেমায় মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করা হয়। এখানে রাজনীতি বা দলীয় মতাদর্শ নয়, বরং বিশুদ্ধ ইসলামী আদর্শই মুখ্য বিষয়। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে অনুষ্ঠিত ইজতেমাগুলোতে কোটি কোটি মুসলমানের অংশগ্রহণ দেখা যায়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় জমায়েত নয়, বরং মুসলিম সমাজের জন্য একটি আত্মসমালোচনার ক্ষেত্র। ইজতেমায় প্রত্যেকে নিজের ‘চরিত্র’ সংশোধনের অঙ্গীকার করে ঘরে ফেরে। ইসলামের ভাষায় বলা যায়, ইজতেমা হল উম্মাহর জন্য এক ধরনের ‘ইমানি মেহনত’, যা মুসলমানদের দুনিয়া ও মৃত্যু পরবর্তী কল্যাণের পথকে সুগম করে।