
রাতের ঘুম মানেই কি পুরো অন্ধকার? অনেকেই কিন্তু তা মানেন না। কারও বিছানার পাশে ছোট ল্যাম্প জ্বলে, কারও টিভির আলো মিটমিট করে, কারও আবার জানলার ফাঁক গলে ঢুকে পড়ে রাস্তার আলো। অনেকেই মনে করেন- এ আর এমন কী! চোখ তো বন্ধই আছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই “সামান্য” আলোই নাকি চুপিসারে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে।
আমাদের শরীর ২৪ ঘণ্টার একটি জৈব ঘড়ির উপর চলে, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। এই ছন্দ ঠিক করে দেয় কখন ঘুম আসবে, কখন শক্তি বাড়বে, কখন হরমোন নিঃসৃত হবে। অন্ধকার নামলে মস্তিষ্ক মেলাটোনিন নামের হরমোন ছাড়ে— যা গভীর ঘুমে সাহায্য করে। কিন্তু আলো থাকলে সেই মেলাটোনিন কমে যায়।
২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় (Proceedings of the National Academy of Sciences-এ) দেখা যায়, মাত্র এক রাত হালকা আলোতে ঘুমোলেই সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের হৃদস্পন্দন বেড়ে যায় এবং ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতায় পরিবর্তন দেখা দেয়। অর্থাৎ শরীর পুরো বিশ্রামে যেতে পারে না।
JAMA Internal Medicine-এ প্রকাশিত একটি পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, যাঁরা নিয়মিত টিভি বা আলো জ্বেলে ঘুমোন, তাঁদের মধ্যে স্থূলতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
গবেষকরা জানান, রাতের কৃত্রিম আলো শরীরের বিপাকক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২০ সালে The Journal of Clinical Endocrinology & Metabolism-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ঘুমের সময় আলোতে থাকলে পরদিন সকালে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হতে পারে।
আলোর রঙও এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, নীলচে আলো, বিশেষ করে মোবাইল, টিভি বা এলইডি স্ক্রিন থেকে আসা আলো মেলাটোনিন দমনে সবচেয়ে শক্তিশালী। এমনকি ক্ষীণ নীল আলোও মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে সবার ক্ষেত্রে সমান নিয়ম প্রযোজ্য নয়। শিশু, বয়স্ক বা অ্যাংজাইটিতে ভোগা কেউ সম্পূর্ণ অন্ধকারে অস্বস্তি বোধ করলে খুব কম তীব্রতার উষ্ণ রঙের নাইট ল্যাম্প ব্যবহার করতে পারেন। আলো যেন চোখে সরাসরি না পড়ে, এবং স্ক্রিন এড়ানোই ভালো। জানলার বাইরের আলো আটকাতে ব্ল্যাকআউট পর্দা ঘরে লাগাতে পারেন।
মাঝে মধ্যে আলো জ্বেলে ঘুমিয়ে পড়া বড় বিপদ ডেকে আনে না। কিন্তু অভ্যাসে পরিণত হলে গবেষণা বলছে— হৃদ্স্বাস্থ্য, ওজন নিয়ন্ত্রণ ও হরমোনের ভারসাম্যে তার প্রভাব পড়তেই পারে।