
আজকের কলকাতায় চৌরঙ্গী মানেই ঝলমলে রাস্তা, অভিজাত হোটেল, সিনেমা হল, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম, অফিসপাড়া আর বহু মানুষের কোলাহল। কিন্তু আপনি কি জানেন এই নামের পেছনে লুকিয়ে আছে বহু শতাব্দী পুরনো ইতিহাস? এই চৌরঙ্গী নামের উৎপত্তি কথা থেকে হল জানেন?
বর্তমান জওহরলাল নেহরু রোড, যা আগে ‘চৌরঙ্গী রোড’ নামে পরিচিত ছিল, সেটি তৈরি হয় শহরের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, ‘চৌরঙ্গী’ শব্দটির নামের উৎপত্তির সাথে ‘চার অঙ্গ’ বিশিষ্ট দেবী চামুণ্ডা বা কালী মূর্তির সম্পর্ক রয়েছে। পুরনো নথি অনুযায়ী, বর্তমান চৌরঙ্গী অঞ্চলে একসময় একটি চার-হাত বিশিষ্ট দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেই থেকেই এলাকাটির নাম ধীরে ধীরে পরিচিত হয় ‘চৌরঙ্গী’ নামে। ‘চৌ’ অর্থ চার, ‘অঙ্গী’ অর্থ অঙ্গ বা দেহাংশ।
লোকমুখে আবার শোনা যায় এই অঞ্চলে একসময় চারটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র বা মন্দির ছিল। সেই চারটি কেন্দ্রকে ঘিরেই এলাকার পরিচিতি গড়ে ওঠে। তবে এর তেমন লিখিত প্রমাণ মেলেনি।
আবার কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে বলা হয়, নাথ যোগী ‘চৌরঙ্গিনাথ’ (Chouranginath) জায়গাটিতে এসেছেন এবং কালী দেবীর একটি প্রতিমা আবিষ্কার করেন। তাঁর নাম থেকেই ধীরে ধীরে এলাকার নাম হয় চৌরঙ্গী। যদিও এই নামকরণেরও তেমন ভাবে লিখিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আবার পুরনো মানচিত্র ও বর্ণনায় রয়েছে “Cherangi” নামে একটি গ্রাম বা এলাকা ছিল যা পরে চৌরঙ্গীতে রূপান্তরিত হয়।
পলাশীর যুদ্ধের পর কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম নির্মাণের পর থেকে ইউরোপীয়রা এখানে বসতি স্থাপন শুরু করে। চৌরঙ্গী রোডে বড় বড় বাড়ি নির্মিত হতে থাকে, তারপরেই কলকাতা ‘প্রাসাদের শহর’ উপাধি পায়। ১৮শ শতকে ব্রিটিশ শাসনের সময় চৌরঙ্গী হয়ে ওঠে কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় বসতি এলাকা। ১৮৬০-এর দশকে জার্মান পণ্ডিত হেনরি ফারডিনান্ড ব্লকম্যান তাঁর বই Calcutta During Last Century তে চৌরঙ্গীর উল্লেখ করেছেন। সেই সময় এটি ছিল জনবহুল নগরের বাইরের একটি গ্রামীণ এলাকা। চৌরঙ্গী নামের উল্লেখ ১৮০০ খ্রিস্টাব্দেরও আগেও করা হয়েছে বলে মনে করা হয়।
আজকের জওহরলাল নেহরু রোড আজও বহন করে চলেছে চৌরঙ্গী নামের ইতিহাস।