মানুষের আগে বিয়ে হবে কলাগাছের সঙ্গে! ‘মাঙ্গলিক’ শুনলেই কেন বুক কাঁপে হবু দম্পতির?
জ্যোতিষশাস্ত্রের নিরিখে বিচার করলে, যখন কোনও জাতক বা জাতিকার কোষ্ঠীতে লগ্ন সাপেক্ষে প্রথম, চতুর্থ, সপ্তম, অষ্টম বা দ্বাদশ স্থানে ‘মঙ্গল’ গ্রহ অবস্থান করে, তাকেই বলা হয় ‘মাঙ্গলিক দোষ’ বা ‘ভৌম দোষ’। শাস্ত্র মতে, মঙ্গল হল তেজ, সাহস এবং রাগের প্রতীক। এই গ্রহের অবস্থান যদি অশুভ হয়, তবে বিবাহিত জীবনে কলহ, মানসিক দূরত্ব, এমনকি জীবনসঙ্গীর অকাল মৃত্যুর মতো চরম আশঙ্কার কথাও বলা হয়ে থাকে।

বিয়ের সানাই বাজার আগেই যদি জ্যোতিষী বলেন পাত্র বা পাত্রী ‘মাঙ্গলিক’, তবে আনন্দের আমেজে যেন হঠাৎই ভয় নেমে আসে। আর সেই ‘ভয়’ কাটাতে এমন এক বিধান দেওয়া হয় যা আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে অনেকের কাছেই অবাক হওয়ার মতো। বেনারসি পরে সাজগোজ করে বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে, রক্ত-মাংসের মানুষের বদলে কলাগাছের সঙ্গে সাতপাক ঘুরতে হয় জাতক বা জাতিকাকে! শুধু হাত ধরাধরি নয়, বিয়ের সমস্ত নিয়মই পালন করা হয় ওই গাছটির সঙ্গে। আপাতদৃষ্টিতে একে অদ্ভুত মনে হলেও, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কলাগাছের সঙ্গে বিয়ের এই রীতি ভারতীয় সমাজে এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু একটি গাছ কীভাবে একজনের ভাগ্য বদলে দিতে পারে? কেনই বা বিয়ের আগেই ‘প্রথম স্বামী’ বা ‘স্ত্রী’ হিসেবে বিসর্জন দেওয়া হয় তাকে?
আসলে এই ‘মাঙ্গলিক দোষ’ কী?
জ্যোতিষশাস্ত্রের নিরিখে বিচার করলে, যখন কোনও জাতক বা জাতিকার কোষ্ঠীতে লগ্ন সাপেক্ষে প্রথম, চতুর্থ, সপ্তম, অষ্টম বা দ্বাদশ স্থানে ‘মঙ্গল’ গ্রহ অবস্থান করে, তাকেই বলা হয় ‘মাঙ্গলিক দোষ’ বা ‘ভৌম দোষ’। শাস্ত্র মতে, মঙ্গল হল তেজ, সাহস এবং রাগের প্রতীক। এই গ্রহের অবস্থান যদি অশুভ হয়, তবে বিবাহিত জীবনে কলহ, মানসিক দূরত্ব, এমনকি জীবনসঙ্গীর অকাল মৃত্যুর মতো চরম আশঙ্কার কথাও বলা হয়ে থাকে। বিশেষ করে যদি একজন মাঙ্গলিক ব্যক্তির সঙ্গে একজন অ-মাঙ্গলিক ব্যক্তির বিয়ে হয়, তবে সেই দাম্পত্য সুখের হয় না বলেই প্রাচীন বিশ্বাস।
কলাগাছের ওপর কেন পড়ে কোপ?
এই ‘দোষ’ কাটানোর জন্যই প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে ‘প্রতীকী তর্পণ’ বা ‘দোষ স্থানান্তর’ প্রক্রিয়া। এর পেছনে মূল ভাবনাটি হল: জ্যোতিষীদের মতে, মাঙ্গলিক দোষের সবচেয়ে বড় কোপ পড়ে প্রথম বিয়ের ওপর। তাই একটি কলাগাছকে প্রথম স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে সাজিয়ে বিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্বাস করা হয়, মঙ্গলের যা কিছু বিষ বা অশুভ নজর, তা ওই গাছের ওপর গিয়েই আছড়ে পড়ে।
বিয়ের আচার মিটে গেলেই নিয়ম মেনে সেই গাছটিকে কেটে ফেলা হয় বা জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়। এর মানে হল—ব্যক্তির প্রথম বিবাহটি কার্যত শেষ হয়ে গেল এবং সেই সঙ্গে যাবতীয় অমঙ্গল ওই গাছটির সঙ্গেই বিদায় নিল।
গাছটি নষ্ট করার পর যখন সেই ব্যক্তি আসল পাত্র বা পাত্রীর সঙ্গে বিয়ে করেন, সেটি শাস্ত্রীয় হিসেবে তাঁর ‘দ্বিতীয় বিবাহ’ বলে গণ্য হয়। যেহেতু প্রথম বিয়ের সঙ্গেই অশুভ শক্তি ধুয়েমুছে গিয়েছে, তাই দ্বিতীয় দাম্পত্যে আর মঙ্গলের কোনও প্রভাব থাকে না বলেই ভক্তদের বিশ্বাস।
আধুনিক মনস্তত্ত্ববিদদের মতে, এটি আসলে বিয়ের আগে মানুষের মনের গভীর ভয় দূর করার একটি মাধ্যম। তবে বিজ্ঞান একে পুরোপুরি অস্বীকার করলেও, বহু নামী তারকা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—অনেকেই আজও এই রীতিতে ভরসা রাখেন। কলাগাছকে বেছে নেওয়ার আরও একটি কারণ হল এর পবিত্রতা। হিন্দু ধর্মে কলাগাছকে অত্যন্ত শুভ ও পুনর্জন্মের প্রতীক ধরা হয়, যা নেতিবাচক শক্তি শুষে নিতে পারে বলে বিশ্বাস।
