Durga Puja 2026: ১০ হাতের ৮ টিই ছোট, বসু বাড়ির মাদুর্গা কেন এমন? নেপথ্যে কোন গল্প?
Basirhat Durga Puja: ধূপের ধোঁয়া, ঢাকের বাদ্যি আর সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো ভক্তি-বিশ্বাসের মেলবন্ধনে জেগে ওঠে ধলতিথার ঐতিহাসিক বসু পরিবার। সাধারণ প্রতিমার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এখানকার মৃণ্ময়ী রূপ—দশ হাত থাকলেও মায়ের আটটি হাত আকারে ছোট এবং মাত্র দু’টি হাত বড়। বিষমবাহু এই অনন্য রূপের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে যেমন এক আশ্চর্যজনক স্বপ্নাদেশের গল্প।

শারদীয়া দুর্গোৎসবের ঢাকের কাঠি পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মেদিনীপুর বা কলকাতার পাশাপাশি উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাটের ধলতিথার হাওয়ায় ভেসে আসে এক চেনা সুবাস। ধূপের ধোঁয়া, ঢাকের বাদ্যি আর সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো ভক্তি-বিশ্বাসের মেলবন্ধনে জেগে ওঠে ধলতিথার ঐতিহাসিক বসু পরিবার। সাধারণ প্রতিমার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এখানকার মৃণ্ময়ী রূপ—দশ হাত থাকলেও মায়ের আটটি হাত আকারে ছোট এবং মাত্র দু’টি হাত বড়। বিষমবাহু এই অনন্য রূপের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে যেমন এক আশ্চর্যজনক স্বপ্নাদেশের গল্প।
আজ থেকে প্রায় ৩৫০ বছর আগে রাধামাধব বসুর হাত ধরে এই পারিবারিক পুজোর সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে জগবন্ধু বসুর আমলে ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা। একবার বোধনের ঠিক আগের দিন হঠাৎ এক পায়রার ঝটপটানিতে ভেঙে যায় দেবীর প্রতিমার একটি আঙুল। এই দুর্ঘটনায় চরম উদ্বিগ্ন ও আশঙ্কিত হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। কথিত আছে, সেই রাতেই জগবন্ধু বসুর মা স্বপ্নে এক অলৌকিক নির্দেশ পান—পুজো কোনভাবেই বন্ধ হবে না, ওই অবস্থায় ভাঙা অঙ্গ নিয়েই দেবীর আরাধনা সম্পন্ন করতে হবে।
এরপর কিছুদিন যেতে না যেতেই আসে দ্বিতীয় স্বপ্নাদেশ। সেখানে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়, এরপর থেকে দেবীর আটটি হাত আকারে ছোট হবে এবং মূল দু’টি হাত হবে বড়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বসিরহাটের এই ঐতিহ্যবাহী বসু বাড়িতে নির্মিত হয়ে আসছে বিষমবাহু ‘কলা ছড়ের’ বিশেষ দুর্গাপ্রতিমা, যা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে আজও ভিড় জমান অগণিত পুণ্যার্থী।
পারিবারিক প্রতিটি নিয়মকানুন আজও অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে বসু বাড়িতে। পুজোর প্রধান উপচারের জন্য প্রতি বছর কলকাতার বাগবাজারের গঙ্গার ঘাট থেকে জোয়ারের পবিত্র জল বয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ধলতিথায়। সেই জলেই আয়োজিত হয় মায়ের মহাস্নান ও মূল পুজো।
শুধু পুজোর দিনগুলোই নয়, বিজয়া দশমীতে মায়ের বিদায়লগ্নেও ফুটে ওঠে সম্প্রীতির এক অপূর্ব দৃশ্যপট। দশমীর দিন বেয়ারাদের কাঁধে চেপে ঐতিহ্যবাহী ঢঙে যখন মায়ের প্রতিমা নদীর ঘাটের দিকে এগোতে থাকে, তখন মাঝপথে একটি মুসলিম পরিবারের বাড়ির সামনে থমকে দাঁড়ায় শোভাযাত্রা। অতীতে ওই মুসলিম পরিবারের সদস্যরা পরম শ্রদ্ধায় প্রতিমার কাঠামোর বাঁধন বা দড়ি কাটতেন। সময়ের আবর্তে সেই শারীরিক প্রথা বন্ধ হলেও, হৃদয়ের গভীর সম্পর্কটুকু আজও অমলিন।
পুরনো স্মৃতি ও সৌহার্দ্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে আজও দশমীর দিন ওই মুসলিম পরিবারের বাড়ির সামনে কিছুক্ষণ পরম আদরে নামিয়ে রাখা হয় মাকে। এরপর পরিবারের সদস্যদের শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষে ফের কাঁধে তুলে নদীর দিকে এগোয় বিসর্জনের মিছিল। পথচলতি আরও কয়েকটি স্থানে গ্রামের সাধারণ নারীরা শেষ মাতৃদর্শনের জন্য অপেক্ষা করেন, আর ধলতিথার মানুষ চোখের জলে বিদায় জানান উমাকে।
সাড়ে তিনশো বছর পেরিয়েও বসিরহাটের এই পুজো তাই শুধু বসু পরিবারের ব্যক্তিগত আয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা হয়ে উঠেছে গোটা এলাকার আবেগ, অটুট বিশ্বাস এবং সম্প্রীতির এক চিরন্তন প্রতীক।
