কলকাতার এই মন্দিরে গভীর রাতে বাজে ঘণ্টা! রহস্যটা জানেন?

এলাকায় বসবাসকারী ইউরোপীয়দের ‘ফিরিঙ্গি’ বলা হত, লোককথা অনুযায়ী অনেক খ্রিস্টান ও বিদেশি মানুষ এই মন্দিরে এসে কালীপুজো দিতেন। কেউ সন্তান লাভের জন্য, কেউ রোগমুক্তির আশায় কেউ আবার ব্যবসায় উন্নতির আশায় মানত করতেন । ধর্ম আলাদা হলেও বিশ্বাসে মা সবার। ধীরে ধীরে মানুষের মুখে মুখে মন্দিরের নাম হয়ে যায় ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি।

কলকাতার এই মন্দিরে গভীর রাতে বাজে ঘণ্টা! রহস্যটা জানেন?

Jan 15, 2026 | 8:14 PM

“খৃষ্টে আর কৃষ্টে কিছু ভিন্ন নাই রে ভাই/ শুধু নামের ফেরে মানুষ ফেরে”—
কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি-র এই গানের বাস্তব রূপ আজও দেখা যায় বৌবাজারের গলিপথে দাঁড়িয়ে থাকা ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি-তে।

এই মন্দিরকে ঘিরে নানা রহস্যময় কাহিনি শোনা যায় । বহু ভক্তের বিশ্বাস, গভীর রাতে যখন কেউ থাকেন না তখন মন্দির চত্বরে ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায়। কেউ কেউ স্বপ্নে মায়ের নির্দেশ পেয়ে দুর দূরান্ত থেকে আসেন এই মন্দিরে। সেই ভক্তদের মতে মা তাঁদের ফেরাননা।

উত্তর কলকাতার বৌবাজার এলাকায় একসময় ইউরোপীয় বণিক ও পর্তুগিজ খ্রিস্টানরা বসতি স্থাপন করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, আঠারো শতকের শেষভাগ থেকে উনিশ শতকের শুরুতে এই এলাকায় একটি শিবমন্দির গড়ে ওঠে। পরে শাক্ত প্রভাবে সেখানে কালীমূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ সেই স্থানই পরিচিত ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি নামে। এই কালীবাড়ির নাম ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি নামকরণ হওয়ার পিছনে শোনা যায় অনেক রকমের গল্প।

এলাকায় বসবাসকারী ইউরোপীয়দের ‘ফিরিঙ্গি’ বলা হত, লোককথা অনুযায়ী অনেক খ্রিস্টান ও বিদেশি মানুষ এই মন্দিরে এসে কালীপুজো দিতেন। কেউ সন্তান লাভের জন্য, কেউ রোগমুক্তির আশায় কেউ আবার ব্যবসায় উন্নতির আশায় মানত করতেন । ধর্ম আলাদা হলেও বিশ্বাসে মা সবার। ধীরে ধীরে মানুষের মুখে মুখে মন্দিরের নাম হয়ে যায় ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি।

আবার ‘স্যার হ্যারি ইভান কটন’-এর বই থেকে জানা যায় এই এলাকায় জঙ্গলের মধ্যেই ছিল মহাশ্মশান। সেই শ্মশানের এক ডোম শ্রীমন্ত, ছোট্ট এক চালাঘরে শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন । মা শীতলাকেও পুজো করতেন তিনি । শ্রীমন্ত ডোম ছিলেন বলে এই মন্দিরে কোনও পুরোহিত পুজো করত চাইতেন না। নিজেই পুজো করতেন শ্রীমন্ত । মা কালীর মূর্তি পরে প্রতিষ্ঠিত হয় এখানে। এই মন্দিরের পিছনে ছিল পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত কবিয়াল অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির মামার বাড়ি। পর্তুগিজ হলেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রেমিক ফিরিঙ্গি কাবিগানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে কালী ও দুর্গার বন্দনা করতেন । শোনা যায়, তিনি নিয়মিত ফিরিঙ্গি কালীবাড়িতে যেতেন এবং মা কালীকে তাঁর কবিগান শোনাতেন । যদিও লিখিত নথিতে তাঁর দ্বারা মন্দির প্রতিষ্ঠার সরাসরি প্রমাণ মেলে না, তবু লোকসংস্কৃতি ও জনশ্রুতি অনুযায়ী মন্দির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির যোগ ছিল। অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি এই মন্দিরের মা কালীর সাধনা করতেন বলে মন্দিরের নাম ফিরিঙ্গি কালীমন্দির হয়েছে বলে মত অনেকের।

সেই সময়তেও ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি ছিল সকল ধর্মের মানুষের মেল বন্ধনের স্থল। এখানে জাতপাত , ধর্মের কড়াকড়ি তুলনামূলকভাবে কম ছিল। খ্রিস্টান, মুসলমান এমনকি বিদেশিরাও মায়ের প্রসাদ গ্রহণ করতেন—যা সেই সময়ের সমাজব্যবস্থায় ছিল বিরল।

প্রতিদিন সকাল ৭ টা থেকে ১২ টা বেজে ১৫ মিনিট অবধি এবং বিকেল সাড়ে চারটে থেকে রাত আটটা অবধি খোলা থাকে এই ফিরিঙ্গি কালীবাড়ি।