AQI
Sign In

By signing in or creating an account, you agree with Associated Broadcasting Company's Terms & Conditions and Privacy Policy.

কলকাতার এই কালীমন্দিরের পিছনে রহস্যময়ী বালিকার অবদান জানেন? এখানে সাধনা হত পঞ্চমুন্ডির আসনে

এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক রহস্যময়ী শিশুকন্যার গল্প। লোককথা এবং মন্দিরের ইতিহাস থেকে জানা যায়, এক সময় প্রায়ই একটি ছোট মেয়ে হরিপদ চক্রবর্তীর কাছে আসত। সে কোলে উঠতে চাইত, তাঁর পাশে বসে থাকত। একজন তান্ত্রিক সাধক হিসেবে প্রথমদিকে তিনি মেয়েটিকে একেবারেই কাছে নিতে চাইতেন না।

কলকাতার এই কালীমন্দিরের পিছনে রহস্যময়ী বালিকার অবদান জানেন? এখানে সাধনা হত পঞ্চমুন্ডির আসনে
| Updated on: Jan 20, 2026 | 11:13 AM
Share

সাধকের বিশ্বাস,ভক্তি ও ঐতিহাসিক কাহিনির মিলনস্থল দক্ষিণ কলকাতার সাদার্ন অ্যাভিনিউ অঞ্চলে অবস্থিত লেক কালীবাড়ি । আজও হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন এই মন্দিরে ভিড় করেন মা কালীর দর্শনের জন্য। জানেন এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে এক তান্ত্রিক এবং মা কালীর এক ভিন্ন রূপের গল্প।

সালটা ১৯৪৯ সালের ১৩ এপ্রিল, দেশভাগের ঠিক দু’বছর পর, তান্ত্রিক সাধক হরিপদ চক্রবর্তী এই স্থানে মা কালীর সাধনা শুরু করেন। তখন এই এলাকা ছিল প্রায় জনমানব শূন্য। একটি ছোট পাতার কুটিরে শুরু হয় মায়ের সাধনা, যা পরবর্তী সময়ে রূপ নেয় আজকের লেক কালী বাড়িতে।

কীভাবে মায়ের সাধনা করতেন হরিপদ চক্রবর্তী?

লেক কালীবাড়ির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে সাধনা। তান্ত্রিক শাস্ত্র অনুযায়ী, পাঁচটি মুন্ডির প্রতীকের উপর নির্মিত এই আসনে বসেই হরিপদ চক্রবর্তী দীর্ঘদিন সাধনা করতেন। ভক্তদের বিশ্বাস, এই আসনে বসে সাধনার মাধ্যমেই বহু মানুষের শারীরিক ও মানসিক সমস্যার সমাধান করতেন তিনি। তবে বর্তমানে সেই আসন সংরক্ষিত রয়েছে।

এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক রহস্যময়ী শিশুকন্যার গল্প। লোককথা এবং মন্দিরের ইতিহাস থেকে জানা যায়, এক সময় প্রায়ই একটি ছোট মেয়ে হরিপদ চক্রবর্তীর কাছে আসত। সে কোলে উঠতে চাইত, তাঁর পাশে বসে থাকত। একজন তান্ত্রিক সাধক হিসেবে প্রথমদিকে তিনি মেয়েটিকে একেবারেই কাছে নিতে চাইতেন না।

তবে ধীরে ধীরে মেয়েটিই তার মেয়ের মত তাঁর ঘরে থাকতে শুরু করে। সাধকের পছন্দ অনুযায়ী রান্না করত, নিঃশব্দে তাঁর সেবা করত। শোনা যায় মেয়েটি যেন সাধকের মনের কথা আগে থেকেই বুঝতে পারত। একদিন কোনও কারণে সাধক মেয়েটিকে বকাঝকা করেন। অভিমান করে একদিন হঠাৎই চলে যায় মেয়েটি। এরপর থেকেই সাধক গভীর শোকে ভেঙে পড়েন। মেয়েটিকে খুঁজেও আর পাওয়া যায়নি। জনশ্রুতি অনুযায়ী এরপর একদিন রাতে স্বপ্নে সেই শিশুকন্যা এসে সাধককে জানায় এতদিন যাঁর সাধনা করে তিনি জীবন কাটিয়েছেন, সেই মা কালীই মেয়েটির রূপে এসে তাঁর সেবা করেছিলেন। মেয়েটি চলে গেলেও তাঁর পায়ের ছাপ রেখে যায় সাধকের ঘরে। এক রাতে স্বপ্নে মা কালী হরিপদ চক্রবর্তীকে দর্শন দেন। মা তাঁকে জানান, স্থানটি তাঁর জন্য পবিত্র এবং সেখানেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে মানবকল্যাণের কাজ করার নির্দেশ দেন মা কালী। তৎকালীন সময়ে হরিপদ চক্রবর্তী ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র। মন্দির নির্মাণের মতো অর্থ তাঁর কাছে ছিল না। ধীরে ধীরে মায়ের কৃপায় অর্থের ব্যবস্থা হয়। একটি ছোট কুটির থেকেই শুরু হয় লেক কালীবাড়ি মন্দির তৈরির যাত্রা।

তারপর এখানে প্রতিষ্ঠিত হন শ্রী শ্রী ১০৮ করুণাময়ী কালীমাতা, দক্ষিণাকালীর বিগ্রহ। ভালবেসে মায়ের নাম ‘করুণাময়ী’ দেন সাধক। মন্দির কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এক সময় এখানে বলি প্রথা চালু ছিল। পরবর্তী সময়ে সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বলি প্রথা বন্ধ করা হয়। গুরুদেবের নির্দেশে বলির পরিবর্তে নিরামিষ ভোগ চালু হয়, যা আজও অনুসরণ করা হয়।

লেক কালীবাড়ির আরেকটি বিশেষ পরিচিতি হল গাড়ির পুজো। বিশেষ করে বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে তাদের গাড়ির পুজো দিতে আসেন। ভক্তদের বিশ্বাস, মায়ের আশীর্বাদে দুর্ঘটনা ও অকাল বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার মন্দিরে ভক্তদের ভিড় সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কালীপুজো, কৌশিকী অমাবস্যা, মন্দির প্রতিষ্ঠা দিবস (১৩ এপ্রিল), হরিপদ চক্রবর্তীর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে বড় করা পুজো হয় এই মন্দিরে।

মন্দিরের উল্টো দিকে রবীন্দ্র সরোবর সংলগ্ন উদ্যানে স্থাপিত রয়েছে হরিপদ চক্রবর্তীর মূর্তি। প্রতি বছর সেখানে বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হয়।

বিশেষ পুজোর দিনে বিপুল পরিমাণ ভোগ নিবেদন করা হয় মাকে। মন্দির কর্তৃপক্ষের মতে, ভক্তদের দেওয়া শাড়ি, গয়না ও অন্যান্য উপহার দুঃস্থ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট, বিকেল ৩টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ৯টা এবং মঙ্গলবার ও শনিবার দুপুর ১টা পর্যন্ত এবং রাত ১০টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে।