Durga Puja 2026: গণেশের বউ নয়, ‘নবপত্রিকা’ বা ‘কলাবউ’ আসলে কে জানেন?
Kala Bou Identity: পৌরাণিক ও শাস্ত্রীয় মতে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। নবপত্রিকা কোনও পৃথক দেবী বা গণেশের বধূ নন; এটি মূলত দেবী দুর্গারই নয়টি ভিন্ন উদ্ভিজ্জ রূপের এক একত্রিত প্রকাশ।'নবপত্রিকা' শব্দের আক্ষরিক অর্থ নয়টি পাতা বা উদ্ভিদ।

মহাসপ্তমীর সকালে মণ্ডপে মণ্ডপে আয়োজন করা হয় ‘নবপত্রিকা’ স্নান। সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত একটি ধারণায় একে ‘কলাবৌ’ এবং সিদ্ধিদাতা গণেশের স্ত্রী হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে পৌরাণিক ও শাস্ত্রীয় মতে এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। নবপত্রিকা কোনও পৃথক দেবী বা গণেশের বধূ নন; এটি মূলত দেবী দুর্গারই নয়টি ভিন্ন উদ্ভিজ্জ রূপের এক একত্রিত প্রকাশ।’নবপত্রিকা’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ নয়টি পাতা বা উদ্ভিদ। নয়টি আলাদা আলাদা বৃক্ষ ও উদ্ভিদের সমন্বয়ে এই বিশেষ প্রতীক তৈরি করা হয়, যা বঙ্গজীবনের প্রাচীন কৃষিসংযোগ ও প্রকৃতি উপাসনার নিদর্শন।
কোন গাছে দেবী দুর্গার কোন রূপের অবস্থান? শাস্ত্র অনুসারে, নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদে দেবী দুর্গার নয়টি বিশেষ রূপ বাস করেন। একেকটি উদ্ভিদ দেবীর একেকটি শক্তির প্রতীক:
১. রম্ভা (কলাগাছ): এতে অবস্থান করেন দেবী ব্রহ্মাণী।
২. কচ্ছ্বী (কচু গাছ): এতে বাস করেন দেবী কালিকা।
৩. হরিদ্রা (হলুদ গাছ): এতে অধিষ্ঠান দেবী উমার।
৪. জয়ন্তী (জয়ন্তী গাছ): এই উদ্ভিদে অবস্থান করেন দেবী কার্তিকী।
৫. বিল্ব (বেল গাছ): এতে বাস করেন ভগবান শিবের প্রিয়া দেবী শিবা।
৬. দাড়িম্ব (ডালিম বা ডালিম গাছ): এতে দেবী রক্তদন্তিকা বিরাজ করেন।
৭. অশোক (অশোক গাছ): এতে অধিষ্ঠিত দেবী শোকরহিতা।
৮. মানক (মানকচু গাছ): এতে থাকেন দেবী চামুণ্ডা।
৯. ধান (ধান গাছ): ধান গাছে বাস করেন দেবী লক্ষ্মী।
এই নয়টি উদ্ভিদকে একত্রিত করে শ্বেতসর্ষে এবং হলুদ সুতো দিয়ে বাঁধা হয়। তারপর তাঁকে লালপাড় সাদা শাড়িতে আবৃত করে ঘোমটা দেওয়া বধূর রূপ দেওয়া হয় বলেই লোকমুখে তিনি ‘কলাবৌ’ নামে পরিচিতি লাভ করেছেন। গণেশের ডান পাশে তাঁকে স্থাপন করা হয় বলে সাধারণ মানুষ ভ্রান্তিবশত তাঁকে গণেশের স্ত্রী মনে করেন। শারদোৎসব মূলতঃ হেমন্তের শুরুতে শস্য শ্যামলা বসুন্ধরাকে ধন্যবাদ জানানোরও এক শুভ মুহূর্ত। প্রাচীন ভারতে যখন প্রাতিষ্ঠানিক মূর্তিপূজার প্রচলন হয়নি, তখন মানুষ প্রকৃতির দান—গাছপালা, নদী এবং নতুন ফসলকেই ঈশ্বর হিসেবে আরাধনা করত। নবপত্রিকার প্রতিটি উপাদান দৈনন্দিন জীবনে ঔষধি গুণসম্পন্ন এবং কৃষিপ্রধান বাংলার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় শস্য। ধান সমৃদ্ধির প্রতীক, হলুদ রোগপ্রতিষেধক, কচু ও মানকচু আকালের খাদ্য, আর অশোক বা বিল্ব শারীরিক ও মানসিক শান্তির প্রতীক। দুর্গোৎসবে নবপত্রিকার পুজো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আদিশক্তি দেবী দুর্গা কেবল মৃন্ময়ী প্রতিমায় সীমায়িত নন; তিনি প্রকৃতির প্রতিটি সবুজ পাতায়, শস্যে এবং উদ্ভিদে জীবন্ত রূপে বিরাজমান। শারদোৎসব তাই কেবল এক আধ্যাত্মিক উদযাপন নয়, বরং প্রকৃতি ও পরিবেশকে রক্ষা করার এবং বসুন্ধরার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক চিরন্তন ঐতিহ্য।
