Durga Puja 2026: জানেন ‘ডাকের সাজ’কে কেন ‘ডাকের সাজ’ বলা হয়?
Durga Puja Dhaker Shaj History: সাবেকি দুর্গোৎসবে প্রতিমা সাজানোর কত না শৈলী রয়েছে—কখনও সোনা-রুপোর গয়না, কখনও আবার তামা বা পিতলের কাজ। তবে এই সমস্ত শৈলীকে ছাপিয়ে বাঙালির মনে চিরকালের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে যে সাজটির সঙ্গে, তা হল ‘ডাকের সাজ’। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, এই সাজটির নাম কেন ‘ডাকের সাজ’? এর নেপথ্যেই বা লুকিয়ে রয়েছে কোন ইতিহাস?

শরতের আকাশ মানেই সাদা মেঘের ভেলা, শিউলি ফুলের গন্ধ আর বাতাসে মায়ের আগমনী বার্তা। আর এই পূজোর আমেজকে পরিপূর্ণতা দেয় প্রতিমার সাবেকি সাজ। খড়, মাটি আর রঙের প্রলেপ পেরিয়ে যখন প্রতিমাশিল্পীর নিপুণ হাতে মা দুর্গা রূপ পান, তখন তাঁর রূপের জাদুতে চোখ জুড়িয়ে যায়। সাবেকি দুর্গোৎসবে প্রতিমা সাজানোর কত না শৈলী রয়েছে—কখনও সোনা-রুপোর গয়না, কখনও আবার তামা বা পিতলের কাজ। তবে এই সমস্ত শৈলীকে ছাপিয়ে বাঙালির মনে চিরকালের আবেগ জড়িয়ে রয়েছে যে সাজটির সঙ্গে, তা হল ‘ডাকের সাজ’। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, এই সাজটির নাম কেন ‘ডাকের সাজ’? এর নেপথ্যেই বা লুকিয়ে রয়েছে কোন ইতিহাস?
উনিশ শতকের মাঝামাঝি কিংবা তারও আগে যখন বাংলায় দুর্গাপুজো মূলত জমিদার বাড়ি বা বনেদি পরিবারগুলোর অন্দরেই সীমাবদ্ধ ছিল, তখন প্রতিমা সাজানোর প্রধান উপকরণ হিসেবে শোলার ব্যবহার শুরু হয়। শোলা কেটে নানা রকম নকশা তৈরি করে প্রতিমার চালচিত্র ও অঙ্গসজ্জা করা হতো। কিন্তু সেই শোলার ওপর ফুটিয়ে তোলা হতো এক বিশেষ ধরনের চকচকে রুপোলি প্রলেপ। এই প্রলেপ বা ফয়েলটি এদেশীয় সাধারণ কারুশিল্পের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল।
আসল রহস্যটি লুকিয়ে রয়েছে এই রূপোলি ফয়েলের আমদানির মধ্যে। সে যুগে এই বিশেষ চকচকে রুপোলি উপাদান বা মেটালিক ফয়েল তৈরি হতো সুদূর জার্মানিতে। সেখান থেকে সমুদ্রপথে জাহাজ বা ডাকযোগে (Postal Mail/Courier) এই কাঁচামাল বা সামগ্রী কলকাতায় আসত। সেই আমলে বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল ‘ডাক বিভাগ’ বা ‘শিপিং পার্সেল সার্ভিস’। বিদেশ থেকে ডাকযোগে এই বিশেষ সাজের উপকরণ আসত বলেই সাধারণ মানুষ এবং কারিগররা এই ধরনের শোলার কাজকে ‘ডাকের সাজ’ বা ‘ডাকের পেপার’ নামে ডাকতে শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নামটিই পাকাপাকিভাবে শোলার সাবেকি সাজের পরিচিতি হয়ে দাঁড়ায়।
ডাকের সাজের মূল বৈশিষ্ট্য হলো তার সাদা-রুপোলি দ্যুতি। শোলাকে অত্যন্ত যত্ন করে কেটে ছোট ছোট কুচি, পাতা, ফুল, ও মুকুটের নকশা তৈরি করা হত। এরপর তার ওপর লাগানো হত সেই বিদেশ থেকে ডাকযোগে আসা পাতলা রুপোলি ফয়েল। সাদার সঙ্গে এই রুপোলি আভার এক অপূর্ব যুগলবন্দী প্রতিমার মুখমণ্ডলে এক স্বর্গীয় ও শান্ত ভাব ফুটিয়ে তুলত। চালচিত্র জুড়ে এই শোলার কারুকার্য দেখতে যেমন মনোরম, তেমনই তার ঐতিহ্য বহন করে বনেদিয়ানার আভিজাত্য।
আজকের দিনে থিম পুজো, ফাইবার কিংবা ফাইবারের গয়না এবং রঙিন আলোর রোশনাইয়ের যুগে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে সর্বত্র। সোনা বা পাথরের আধুনিক গয়নায় সেজে উঠছেন অনেক প্রতিমা। তা সত্ত্বেও কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ি, সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার কিংবা উত্তর কলকাতার বহু বনেদি বাড়ির পুজোয় আজও দেবীকে বরণ করা হয় সেই প্রাচীন ‘ডাকের সাজ’-এই। কারণ, এই সাজ কেবল প্রতিমার রূপটান নয়, এটি বাংলার আবহমানকালের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সুদূর অতীতের এক জীবন্ত দলিল। যতদিন বাঙালি থাকবে, শারদোৎসব থাকবে, ততদিন বিদেশের ডাক পেরিয়ে আসা এই শোলার রুপোলি সাজ বাঙালির নস্ট্যালজিয়া হয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
