পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের পাহারাদার স্বয়ং বজরংবলী! কেন শ্রীক্ষেত্রেই ‘বন্দি’ হতে হল পবনপুত্রকে?
মস্যা দেখা দিত অন্য জায়গায়। হনুমান যেখানেই শ্রীরামের নাম সংকীর্তন বা ভজন শুনতেন, সব কাজ ফেলে সেই রামধুন শুনতেই ব্যাকুল হয়ে পড়তেন। পাহারার দায়িত্ব ছেড়ে তিনি চলে যেতেন রাম ভজনের আসরে। আর সেই সুযোগেই সমুদ্রের নোনা জল মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করে ক্ষতিসাধন করত।

ভারতের চার ধামের অন্যতম এবং ওড়িশার গর্ব পুরীর জগন্নাথ মন্দির। মহাপ্রভু জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রার এই লীলাক্ষেত্রের মাহাত্ম্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই মন্দিরের প্রধান পাহারাদার কে? অবাক করা বিষয় হল, স্বয়ং রামভক্ত হনুমান যুগ যুগ ধরে এই মন্দিরের সুরক্ষা নিশ্চিত করে আসছেন। তবে এক বিশেষ কারণে এই মন্দিরে বজরংবলীর পায়ে আজীবন বেড়ি বা শিকল পরিয়ে রেখেছেন স্বয়ং ভগবান জগন্নাথ।
পুরীর মন্দিরের কাছেই রয়েছে একটি প্রাচীন হনুমান মন্দির, যা লোকমুখে ‘বেড়ি হনুমান’ নামে পরিচিত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যখন ভগবান বিষ্ণুর আদেশে এই বিশাল মন্দিরের নির্মাণ করেন, তখন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ তিন তিনবার মন্দিরটি ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেছিল। মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষায় এবং সমুদ্রের ঢেউকে নিয়ন্ত্রণ করতে জগন্নাথদেব তাঁর পরম ভক্ত হনুমানকে পাহারার দায়িত্ব দেন। পুরাণ ও লোককথা অনুযায়ী, পবনপুত্র হনুমান তাঁর দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছিলেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিত অন্য জায়গায়। হনুমান যেখানেই শ্রীরামের নাম সংকীর্তন বা ভজন শুনতেন, সব কাজ ফেলে সেই রামধুন শুনতেই ব্যাকুল হয়ে পড়তেন। পাহারার দায়িত্ব ছেড়ে তিনি চলে যেতেন রাম ভজনের আসরে। আর সেই সুযোগেই সমুদ্রের নোনা জল মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করে ক্ষতিসাধন করত।
ভক্তের এই ‘ভক্তি-পলায়ন’ রুখতে শেষ পর্যন্ত এক অভিনব উপায় বের করেন মহাপ্রভু জগন্নাথ। তিনি হনুমানকে সোনার শিকল বা বেড়ি দিয়ে সেই স্থানেই আটকে রাখেন। উদ্দেশ্য ছিল একটাই যাতে হনুমান সর্বদা সমুদ্রের ধারে উপস্থিত থেকে ঢেউ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং মন্দিরের সুরক্ষা বজায় রাখেন। ভক্তের ওপর ভগবানের এই ‘মধুর শাসন’ আজও বিদ্যমান।
পুরীর ‘বেড়ি হনুমান’ মন্দিরে আজও হনুমানের পায়ে শিকল দেখা যায়। ভক্তদের বিশ্বাস, আজও প্রভুর আদেশ পালন করে সমুদ্রের গর্জনের সামনে বুক চিতিয়ে মন্দির রক্ষা করছেন বজরংবলী। শ্রীরামের প্রতি ভালোবাসা আর জগন্নাথের প্রতি কর্তব্যের এই অদ্ভুত মেলবন্ধনই পুরীর মন্দিরকে করে তুলেছে আরও রহস্যময় ও পবিত্র। প্রতি বছর দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত জগন্নাথ দর্শনে এসে এই ‘বেড়ি হনুমান’-এর আশীর্বাদ নিতে ভোলেন না। ভক্তি আর অলৌকিকতার এই কাহিনি আজও ওড়িশার ঘরে ঘরে মুখে মুখে ফেরে।
