AQI
Sign In

By signing in or creating an account, you agree with Associated Broadcasting Company's Terms & Conditions and Privacy Policy.

কোন জাদুতে ১৭০ বছর ধরে গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে দক্ষিণেশ্বর? জানেন কেন হেলে পড়েনি?

আজ এত বছর পার করে এসেও দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির কিন্তু এক চুলও হেলে পড়েনি। অনেকে একে ‘মায়ের মহিমা’ বলেন, তবে এই ভক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক আশ্চর্য বিজ্ঞান যা আধুনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংকেও টেক্কা দিতে পারে।

কোন জাদুতে ১৭০ বছর ধরে গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে দক্ষিণেশ্বর? জানেন কেন হেলে পড়েনি?
Image Credit: wikipedia
| Updated on: Mar 22, 2026 | 2:15 PM
Share

ভেবে দেখুন তো, গঙ্গার ধারের সেই ভেজা স্যাঁতসেঁতে বালি আর কাদা মাটি- যেখানে একটা সাধারণ কংক্রিটের বাড়ি কয়েক দশক গেলেই নোনা ধরে ক্ষয়ে যেতে শুরু করে, সেখানে ১৭০ বছর ধরে কী অবলীলায় দাঁড়িয়ে আছে ১০০ ফুটের এক বিশাল ইমারত! ১৮৪৭ সালে রানি রাসমণি যখন দক্ষিণেশ্বর মন্দির তৈরির স্বপ্ন দেখছেন, তখন সবথেকে বড় প্রশ্ন ছিল- গঙ্গার এই নরম পলিমাটিতে অত ভারী মন্দির কি আদতেও টিকে থাকবে? নাকি তাসের ঘরের মতো তলিয়ে যাবে গঙ্গার গর্ভে?

আজ এত বছর পার করে এসেও দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির কিন্তু এক চুলও হেলে পড়েনি। অনেকে একে ‘মায়ের মহিমা’ বলেন, তবে এই ভক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এমন এক আশ্চর্য বিজ্ঞান যা আধুনিক সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংকেও টেক্কা দিতে পারে। কোনও অলৌকিক ম্যাজিক নয়, দক্ষিণেশ্বরের অটল থাকার রহস্য লুকিয়ে আছে এর নির্মাণ কৌশলে। জানেন কীভাবে ১৭০ বছর ধরে গঙ্গার সব প্রতিকূলতাকে জয় করে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এই মন্দির?

সাধারণত যে কোনও বাড়ির তলা সমান হয়। কিন্তু দক্ষিণেশ্বর মন্দির তৈরি হয়েছে ‘কূর্ম পৃষ্ঠ’ প্রযুক্তিতে। সহজ করে বললে, পুরো মন্দিরের ভিত বা ফাউন্ডেশনটি তৈরি করা হয়েছে একটি উল্টানো কচ্ছপের পিঠের মতো। মাঝখানটা উঁচু আর ধারগুলো ঢালু। এর ফলে বৃষ্টির জল মন্দিরের নিচে জমতে পারে না, দ্রুত দু’পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফলে মন্দিরের তলার মাটি কখনওই আলগা হতে পারেনা। এছাড়া গঙ্গার ঢেউ যাতে মাটি ধুয়ে নিতে না পারে, তার জন্য ঘাটের সিঁড়িগুলোকে বিশেষ ধাপে তৈরি করা হয়েছে, যা জলের ধাক্কাকে ওখানেই ভেঙে দেয়।

মন্দিরের মাথায় যে সুন্দর নয়টি চূড়া বা ‘নবরত্ন’ দেখা যায়, তা কিন্তু কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়। এটি আসলে বাতাসের দাপট সামলানোর একটি বিশেষ কৌশল। বঙ্গোপসাগরের বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় যখন মন্দিরে আছড়ে পড়ে, এই চূড়াগুলো প্রাকৃতিকভাবেই সেই বাতাসের গতিবেগকে ছড়িয়ে দেয়। এছাড়া এই ভারী চূড়াগুলোর বিপুল ওজন মন্দিরের চারদিকের দেওয়ালকে এমনভাবে চেপে ধরে রাখে যে, ভেতরের খিলানগুলো কোনও সাপোর্ট ছাড়াই শতাব্দীর পর শতাব্দী নিজের জায়গায় অটল হয়ে আছে।

মন্দির প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধ ১২টি শিব মন্দিরের গঠনও বেশ অদ্ভুত। মন্দিরগুলোর মাঝখানে খুব সরু গলিপথ রাখা হয়েছে। গঙ্গা থেকে আসা ঠান্ডা বাতাস যখন এই সরু গলি দিয়ে ঢোকে, তখন বিজ্ঞানের নিয়ম মেনে বাতাসের গতিবেগ হঠাৎ অনেকটা বেড়ে যায়। এর ফলে তপ্ত গরমের দুপুরেও কোনও পাখা বা এসি ছাড়াই পুরো মন্দির চত্বর প্রাকৃতিকভাবেই ঠান্ডা থাকে। ভক্তরা যখন প্রাঙ্গণে পা রাখেন, এক নিমেষে শরীর জুড়িয়ে যায়।

রানি রাসমণির যুগে আজকের মতো সিমেন্ট ছিল না। অথচ মন্দিরের ইঁটগুলো আজও পাথরের মতো শক্ত। এর রহস্য হল ‘বজ্রলেপ’। চুন-সুরকির সঙ্গে গুড়, বিউলি ডাল আর এক ধরণের বুনো ফলের রস মিশিয়ে এই আঠা তৈরি করা হয়েছিল। এই মিশ্রণটি ইঁটের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে এমন এক বন্ধন তৈরি করেছে যা আজকের সিমেন্টের চেয়েও বেশি দীর্ঘস্থায়ী। আর বাইরের লাল ইঁটের কারুকাজগুলো ঢাল হয়েমন্দিরের মূল কাঠামোকে রক্ষা করছে।

ভক্তি আর বিজ্ঞানের মেলবন্ধনে দক্ষিণেশ্বর মন্দির এক কালজয়ী সৃষ্টি। রানি রাসমণি আর সেই সময়ের নাম না জানা কারিগররা প্রমাণ করে গিয়েছেন যে, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে সময়কেও হার মানানো সম্ভব।

Follow Us