
ভারতীয় সংস্কৃতিতে জ্ঞানকে কেবল তথ্য বা পড়াশোনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। জ্ঞান মানে বোধ, বিবেক এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। এই ধারণার প্রতিক হিসাবে প্রতি বছর বিদ্যার দেবী হিসেবে, সরস্বতীর আরাধনা করা হয়। এই বছর দেবীর আরাধনার দিন ২৩ শে জানুয়ারী। অনেকের মনেই প্রশ্ন আসে, লক্ষ্মী যেখানে সমৃদ্ধির দেবী, দুর্গা শক্তির প্রতীক সেখানে সরস্বতীকেই কেন জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী বলা হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে প্রাচীন শাস্ত্র, ভাষাতত্ত্ব এবং আধুনিক মনোবিজ্ঞানের ব্যাখ্যায়।
সরস্বতী নামের উৎপত্তি কোথা থেকে হয়েছে জানেন?
‘সরস্বতী’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘সরস্’ থেকে, যার অর্থ প্রবাহ। ভারতীয় দর্শনে জ্ঞানকে কখনও স্থির বলে ধরা হয় না; জ্ঞান প্রবাহমান, ক্রমাগত বিকশিত। ঋগ্বেদে সরস্বতী প্রথমে একটি নদীর রূপে উল্লেখিত হলেও পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে তিনি জ্ঞানের ধারক রূপে প্রতিষ্ঠিত হন। ঋগ্বেদের দ্বিতীয় মণ্ডলের একাধিক জায়গায় সরস্বতীকে বুদ্ধিকে শুদ্ধ করার শক্তি হিসাবে ধরা হয়। এই কারণেই তাঁকে বিদ্যার দেবী হিসেবে মানা হয়।
সরস্বতীর প্রতিটি প্রতীক জ্ঞানের আলাদা দিক নির্দেশ করে। তাঁর হাতে থাকা বীণা সৃজনশীলতা ও শৃঙ্খলার প্রতীক। সঙ্গীত যেমন নিয়মের মধ্যে স্বাধীনতা শেখায়, তেমনই জ্ঞানও নিয়ন্ত্রিত চিন্তার মাধ্যমে বিকশিত হয়। দেবীর বাহন হাঁস বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। শাস্ত্র অনুযায়ী হংস নীর ও ক্ষীর আলাদা করতে পারে—অর্থাৎ সত্য ও অসত্য বিচারের ক্ষমতা রয়েছে।
Educational Psychology এবং Cognitive Science-এর গবেষণায় বলা হয়েছে, কোনও কিছু শেখার সময় মনোযোগ, সৃজনশীলতা ও স্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। American Psychological Association-এর প্রকাশিত এক গবেষণায় উল্লেখ রয়েছে, সংগীতচর্চা ও পড়াশোনার অভ্যাস মস্তিষ্কের নিউরাল কানেকশন শক্তিশালী করে।
আর এই সব উপাদানই সরস্বতীর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। যা প্রমাণ করে, হিন্দুশাস্ত্রের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানেরও একটা যোগসূত্র রয়েছে। সরস্বতী পুজো শুধুমাত্র ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি শিক্ষা ও আত্মশুদ্ধির প্রতীক। এই পুজোর মাধ্যমে ছাত্রছাত্রীদের শেখানো হয়—বিদ্যা যেন অহংকারের কারণ না হয়, বরং মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি করে।