
সোমনাথ ব্যানার্জি
কলকাতা ময়দানে এই মুহূর্তে চর্চিত একটি নাম কৌস্তভ দত্ত। তাঁর করা শেষ মুহূর্তের অলিম্পিক গোলেই প্রথম বার বেঙ্গল সুপার লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে হাওড়া হুগলি ওয়ারিয়র্স। কৌস্তভের উঠে আসা রিলায়েন্স যুব দল থেকে। খেলেছেন ইস্টবেঙ্গলের যুব দলেও। বিএসএল খেলতে গিয়ে পেয়েছেন ব্যারেটোর মত কিংবদন্তির সান্নিধ্য। ২৩ বছরের এই যুবকের পরবর্তী লক্ষ্য কী? সে সব টিভি নাইন বাংলার কাছে মন খুললেন কৌস্তভ।
প্রশ্ন: অভিনন্দন, প্রথম বেঙ্গল সুপার লিগে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য। ক্রিকেটের বাড়বাড়ন্তের যুগে ফুটবল প্রেম কেন?
কৌস্তভ : ছোট থেকেই রাজারহাট নারায়ণপুরের পাড়ায় ফুটবল খেলতাম। তখন ভাবিনি এটাই পেশা হয়ে যাবে। আমার ছোটবেলার কোচ নেপাল ঘোষ, যিনি বাবার খুব ঘনিষ্ট বন্ধু, তিনি বাবাকে অনুরোধ করেন, তাঁর কোচিং ক্যাম্পে আমাকে ভর্তি করাতে। কিন্তু বাড়িতে লেখাপড়াকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হত। তাও বাবা আমাকে ভর্তি করে দেন। ওখান থেকে বয়সভিত্তিক একটি টুর্নামেন্টে খেলি। ওখানে স্কাউটিং হয়েছিল। সেখান থেকেই আমাকে রিলায়েন্সের অ্যাকাডেমির জন্য ট্রায়ালে ডাকা হয়। সুযোগও পেয়ে যাই। সেই শুরু।
প্রশ্ন: করোনা কতটা মুশকিলে ফেলেছিল?
কৌস্তভ : খুব দুঃসহ ছিল সময়টা। ওই পরিস্থিতিতে আগে পড়িনি। একজন ফুটবলারের জন্য আরও কঠিন ছিল। কারণ আপনার ফর্ম পড়ে যেতে পারে। কেরিয়ারের জন্য মারাত্মক। আমি অবশ্য সে সময় কাটিয়ে হায়দ্রাবাদ এফসি-তে খেলার সুযোগ পাই। ওদের যুব দলের হয়ে ডুরান্ড, আইএফএ শিল্ড খেলি। আরএফডিএল টুর্নামেন্টেও খেলি। এগুলো আমার অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছিল। সেখান থেকে ফিরি কালিঘাট এমএস-এ। ওদের হয়ে ২০২৩ সালে কলকাতা লিগেও খেলি। তারপরই আমাকে ইস্টবেঙ্গল অফার দেয়।
প্রশ্ন : ইস্টবেঙ্গল পর্ব তো সুখকর হয়নি। চোট-আঘাতে জর্জরিত হয়ে গিয়েছিলেন…
কৌস্তভ : আরএফডিএল শুরুর আগেই একটা বড় চোট লাগে। ৬ মাস মাঠের বাইরে চলে গিয়েছিলাম। ইস্টবেঙ্গল প্রথম থেকেই খুব সাপোর্ট করেছিল। ফোন যোগাযোগ রাখা থেকে চোটের চিকিৎসা— সব দিকেই দল পাশে ছিল। আমার মতো যুব দলের ফুটবলারের কাছে বিশাল বড় প্রাপ্তি।
প্রশ্ন : ফাইনালে ভেবেছিলেন, কর্নার থেকে গোল করে ফেলবেন?
কৌস্তভ : একেবারেই জানতাম না, গোল হয়ে যাবে। আমি শুধু চেয়েছিলাম, বলটা তিনকাঠির মধ্যে রাখতে। যাতে সতীর্থরা হেডের সুযোগ পায়। গোল হয়ে যাবে, নিজেও ভাবিনি। আমার মনে হয় ভগবানের আশীর্বাদে গোলটা হয়েছে।
প্রশ্ন: ব্যারেটোর মতো ফুটবলার দলের দায়িত্বে। কোচ হিসেবে তিনি কেমন?
কৌস্তভ: ব্যারেটোর মতো লেজেন্ডের সান্নিধ্য পাওয়া বিরাট ব্যাপার। খেলোয়াড় জীবনে অনেক মুহূর্ত আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতেন। ওঁর মূল বক্তব্য ছিল, ট্রেনিংয়ে নিজের ১০০% দাও। ওঁর ওই কথাগুলো তাতিয়ে দিত দিত ভালো পারফরম্যান্স করার। কোনও ম্যাচে ভুল হলে বলতেন, পরের ম্যাচে ভুল শুধরে নিতে। রিলায়েন্সের যুব খেলার সময় প্রথম ৩ বছর ওঁকে কোচ হিসেবে পেয়েছি। তাই ব্যারেটো স্যারের দর্শনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধে হয়নি। ওঁকে কোচ হিসেবে বৃহত্তর পর্যায়ে পাওয়াটা আমাকে বাড়তি অক্সিজেনও দিয়েছিল। ব্যারেটো স্যারের কাছে যতটা পেরেছি, নিংড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমাকে ফাইনালে সুযোগ দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞ।
প্রশ্ন: গোলের পর কী বলেছিলেন ব্যারেটো?
কৌস্তভ: উনি তো গোলটা হতেই সেলিব্রেট করছিলেন। আমি স্যারকে এতটা আবেগতাড়িত হতে খুব কম দেখেছি। উনি বরাবরই শান্ত। চাপের মধ্যেও একেবারে কুল। আমি গোলটার পর ব্যারেটো স্যার বলেছিলেন, এই কারণেই তোমাদের বলতাম, ১০০% দেওয়ার চেষ্টা করো। ফল পাবেই। স্যারের ওই কথাটা আমাকে অনুপ্রেরণিত করেছে।
প্রশ্ন: ব্যারেটোর মতো প্রাক্তন ফুটবলারের ডাগ আউটে উপস্থিতি কতটা মোটিভেট করেছে?
কৌস্তভ: উনি আমাদের কাছে বড় ইন্সপিরেশন। ছেলেবেলাতে ওঁকে খেলতে দেখেছি। দলের ট্রেনিংয়ে, মিটিংয়ে নিজের কেরিয়ার নিয়ে উদাহরণ দিতেন। তাঁর সময়ে কী কী হত, কতটা কঠিন সময় পার করে এসেছেন, সেই গল্প করতেন। আমরা শুধু ওঁর নির্দেশ পালন করেছি।
প্রশ্ন: আইএসএলে বা আই লিগে খেলার কোনও সুযোগ আছে? মোহনবাগান অফার করলে খেলবেন?
কৌস্তভ: আই লিগের দুটো দলের সঙ্গে কথা চলছে। দেখা যাক, কোন দলের হয়ে খেলার সুযোগ পাই। যে দলে বেশি গেমটাইম পাব, সেখানে খেলতে চাই। এই বয়সটা খেলার জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইস্টবেঙ্গলে আগে খেলেছি। যদি মোহনবাগান অফার করে, ভেবে দেখব।
প্রশ্ন: সামনেই বিশ্বকাপ। কোন দলকে সমর্থন করবেন?
কৌস্তভ: অবশ্যই আর্জেন্টিনা। মেসি কলকাতায় এসেছিল যখন, বেঙ্গল সুপার লিগের খেলা থাকায় যেতে পারিনি। একটা আক্ষেপ রয়েছে। হয়তো কোনও দিন দেখা হবে আমাদের…!