
খাচ্ছেন, ঘুমাচ্ছেন, অফিস যাচ্ছেন। আবার ইট-স্লিপ-রিপিট! তবে আসল জীবনচক্রটা তো এমন নয়। জন্ম, জীবনের নানা ধাপ এবং ক্রমান্বয়ে মৃত্যু। পার্থিব অস্তিত্বকে যদি কোষীয় স্তরে গিয়ে দেখা যায়, তাহলে ছবিটা আর এত সরল থাকে না। আপনি আর এই পৃথিবীতে হেঁটে যাওয়া প্রায় ৮১৫ কোটি মানুষের প্রত্যেকেই আসলে প্রায় ৩০ লক্ষ কোটি কোষের এক একটা নক্ষত্রপুঞ্জ। শরীর মানে শুধু ‘আমি’ নই—মানুষের কোষ আর অসংখ্য অণুজীব একসঙ্গে কাজ করে যে সমষ্টি তৈরি করে, সেটাকেই মস্তিষ্ক ‘জীবন’ বলে চিহ্নিত করে, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অন্তত কিছু কোষের ক্ষেত্রে মৃত্যু মানেই শেষ নয়। বরং মৃত্যু হতে পারে একেবারে নতুন, অপ্রত্যাশিত কিছুর শুরু। তাহলে কি মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকছে কেউ কেউ? না ভূত নয়…
মৃত্যু যে আসলেই মৃত্যু নয়―এই ভাবনাকে আরও জোরালো করছে এক নতুন ধরনের গবেষণা। এআই-এর সাহায্যে তৈরি বহু-কোষী জীব, যাদের বলা হচ্ছে ‘জেনোবট’। এবার আপনাদের মনে হতে পারে, এই জেনোবট আবার কী? এই বট এমন কিছু কোষের সমষ্টি, যারা নিজেদের স্বাভাবিক জৈবিক কাজ ছেড়ে নতুন ভূমিকা নেয়। যেমন—যে সিলিয়া সাধারণত শ্লেষ্মা পরিবহনে কাজ করে, সেগুলোই এখানে ব্যবহার হচ্ছে চলাচলের জন্য। কোষগুলো যেন নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলে। গবেষকদের মতে, এখানেই জন্ম নিচ্ছে জীবনের এক ‘তৃতীয় অবস্থা’—যেখানে কোনও জীবের মৃত্যু হলেও তার কোষগুলো নতুনভাবে সংগঠিত হয়ে সম্পূর্ণ নতুন কিছু তৈরি করতে পারে। প্রকৃতিতে হয়তো এমন রূপ স্বাভাবিকভাবে দেখা যায় না, কিন্তু জেনোবট দেখিয়ে দিচ্ছে—পরিবেশ বদলালে কোষের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা কতটা বিস্ময়কর। শরীরের সঙ্গে যুক্ত না থেকেও একটি কোষীয় সমষ্টি কি সদা পরিবর্তনশীল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে? তা স্পষ্ট হবে এই গবেষণায়।
মানুষের কোষ দিয়েও এমন পরীক্ষা হয়েছে, যাদের বলা হচ্ছে ‘অ্যান্থ্রোবট’—এবং সেখানেও একই ধরনের আচরণ দেখা গিয়েছে। গবেষকরা সাফ জানিয়েছেন যে এই সব আবিষ্কার আমাদের সেই চিরাচরিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে, যেখানে আমরা ভাবি—কোষ বা জীব কেবল পূর্বনির্ধারিত পথেই বিবর্তিত হতে পারে। তবে এই ‘তৃতীয় অবস্থা’ ইঙ্গিত দেয় যে, মৃত্যুও সময়ের সঙ্গে জীবনের রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
এই কোষীয় রোবট বা বায়োবট-এর সম্ভাবনা বিশাল। ভাবুন তো—নিজের শরীরের কোষ দিয়েই তৈরি এমন ওষুধ, যা শরীর কখনও প্রত্যাখ্যানই করবে না।যদিও এর পাশাপাশি উঠে আসছে আরও গভীর প্রশ্ন—একটি কোষ আসলে কী? জানেন তো, বিবর্তনবিদ ও চিকিৎসক উইলিয়াম মিলারের একটি তত্ত্ব রয়েছে, তার গালভরা নামটি হল ‘সেলুলার বেসিস অব কনশাসনেস’ (CBC)। তা সেখানে মিলার কী বলছেন? বিজ্ঞানীর দাবি, কোষের মধ্যেও একধরনের চেতনা থাকতে পারে। আর এক্ষেত্রে জেনোবট নাকি দেখিয়ে দেয় যে আমরা আমাদের শরীরের কোষগুলোর বুদ্ধিমত্তা ও সচেতনতাকে কতটা অবমূল্যায়ন করি।
আসলে কী বলুন তো? পুরো দেহ আর আগের মতো সাড়া না দিলেও, কিছু কোষ মৃত্যুর পরেও সক্রিয় থাকে—তারা দেহ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়, সমস্যা সমাধান করে। আর এতে জীবনের কাঠামো সম্পর্কে আমাদের ধারণাটাই বদলে যায়। জীববিজ্ঞানের মৌলিক একক আসলে সচেতন কোষ এবং তাই আসলে চেতনা—এই ধারণাটা বরাবরই ধোঁয়াটে।
সপ্তদশ শতকের দার্শনিক রেনে দেকার্ত মনে করতেন, শুধু মানুষের মনই সচেতন। আর আজ বিজ্ঞান জানে—প্রাণিজগতে নানা ধরনের চেতনা রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই যেসব জীবনরূপ আমাদের মতো নয়, তাদের বুদ্ধি বা সচেতনতা চিনতে গিয়ে মানুষের নিজস্ব পক্ষপাত ঢুকে পড়ে। টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী মাইকেল লেভিন বলেন,’মানুষ খুব ছোট বা খুব বড় জিনিসের মধ্যে বুদ্ধিমত্তা চিনতে পারে না। আমরা মাঝারি আকারের, মাঝারি গতিতে চলা বস্তুর মধ্যেই মূলত বুদ্ধি খুঁজি।’ মিলারের মতে, যদি কোষকে সচেতন ধরা হয়, তাহলে তা জীববিজ্ঞানে এক মৌলিক পরিবর্তন এনে দেয়—এবং ‘যোগ্যতমের টিকে থাকা’র মতো কিছু নব্য-ডারউইনীয় ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে, কারণ কোষ একা নয়—তাদের সফল হতে হয় একসঙ্গে কাজ করে।
একবার ভাবুন। আপনার দেহের প্রত্যেক কোষ এতটাই ক্ষুদ্র যে তাদের খালি চোখে দেখাই যায় না। জীবজগতের ক্ষুদ্রতম একক হিসাবে যারা গিজগিজ করে আমাদের দেহে, তাদের ভূমিকা যে এতটা বেশি, আগে ভেবেছেন? চামড়ায় সামান্য কেটে গেলে ক্ষত সেরে যায় নিমেষে, অথচ কয়েক লক্ষ কোষ খরচ হয়ে যায় অচিরেই।