
বাঁকুড়া: তিনি নার্স। নিজের সেই দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে আরও ভূমিকায় দেখা যাবে তাঁকে। কখনও ডাক্তারের অনুপস্থিতিতে রোগী দেখছেন। কখনও টেকনিশিয়ানের দায়িত্ব পালন করছেন। এমনই ছবি ধরা পড়েছে বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত বারিকুল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। তা নিয়ে শাসক-বিরোধী তরজা বেধেছে। কিন্তু, সোহালী হেমব্রম নামে ওই নার্স কেন চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান এবং ফার্মাসিস্টের দায়িত্ব পালন করছেন?
কাগজে কলমে বারিকুল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন চিকিৎসক আছেন ঠিকই। কিন্তু তাঁর মাথার উপর রয়েছে একাধিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব সামলে সপ্তাহে বড়জোর দুই থেকে তিন দিন হাসপাতালে উপস্থিত থাকতে পারেন ওই চিকিৎসক। বাকি দিনগুলি হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা একাই সামাল দেন কর্তব্যরত ওই নার্স। সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ দিন তাঁকেই সামলাতে হয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান এমনকী ফার্মাসিস্টের দায়িত্ব। ফলে ন্যূনতম চিকিৎসাটুকু পেতেও জঙ্গলমহলের বারিকুলের মতো প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে ছুটতে হয় ১০ -১২ কিমি দূরের রানিবাঁধ ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। যাকে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা।
বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের বারিকুল একসময় বারেবারে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে মাওবাদী কার্যকলাপের জন্য। সেসময় বিরোধীরা দাবি করত, এলাকার অনুন্নয়নের সুযোগ নিয়ে বারিকুলকে নিজেদের ঘাঁটি শক্ত করেছে মাওবাদীরা। রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর এলাকা থেকে মাও আতঙ্ক দূর হলেও বাঁকুড়ার বারিকুল আছে বারিকুলেই। তার অন্যতম হাতে গরম প্রমাণ বারিকুল প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এলাকার কমপক্ষে ১৫টি গ্রামের মানুষ বারিকুল প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন হাসপাতালে শতাধিক রোগীর ভিড় জমে।
হাসপাতালে একজন চিকিৎসক আছে ঠিকই। কিন্তু তাঁর কাঁধে থাকা গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিষেবার অন্যান্য কাজ সামাল দিতে গিয়ে সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন তিনি হাসপাতালে হাজির থাকতে পারেন না। হাসপাতালে টেকনিশিয়ান ও ফার্মাসিস্টের পদও খালি। অগত্যা সপ্তাহের যে দিনগুলিতে হাসপাতালে চিকিৎসক থাকেন না, সেই দিনগুলিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত একমাত্র নার্স সোহালী হেমব্রমই সামাল দেন চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান এমনকি ফার্মাসিস্টের কাজও। রোগী দেখার ফাঁকে নার্স সোহালী হেমব্রম বললেন, “আজকে স্যারকে অন্য জায়গায় ডিউটি দেওয়া হয়েছে। সেজন্য আমি রোগী দেখছি। রোগী দেখা থেকে শুরু করে ইঞ্জেকশন দেওয়া, ওষুধ দেওয়া সব করতে হয়। কর্মী না থাকায় সব করতে হয়। কিছু করার নেই। যতটা পারি, ততটা করি। প্রতিদিন ১০০ জনের বেশি রোগী হয়।”
হাসপাতালে পরিকাঠামোর হালও তথৈবচ। হাসপাতালের নিজস্ব ভবনের একাংশ ব্যবহার হলেও বাকি অংশ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে থাকতে পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। হাসপাতাল চত্বরেই থাকা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মীদের আবাসনও পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসার জন্য আসা কমলসেন সর্দার, সুখেন সর্দাররা বলছেন, “ডাক্তার নেই। চারিদিক ভাঙাচোরা। এখন তো তাও একজন ডাক্তার এসেছেন। আগে ডাক্তারই ছিল না। আমরা সবদিন ডাক্তারকে পাই না। নার্সই ওষুধ দেন। ডাক্তার প্রতিদিন থাকলে আমাদের সুবিধা হয়।”
জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক শ্যামল সরেনের দাবি, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকেরা বিভিন্ন সময়ে টেলি মেডিসিন ও প্রত্যন্ত গ্রামে গ্রামে ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্য পরিষেবা দিচ্ছেন। পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার কথা মানতে নারাজ স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকরা।
বিষয়টি নিয়ে বিরোধীরা রাজ্য সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছে। প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ সুভাষ সরকার বলেন, “একসময় এই বারিকুলে রীতিমতো চিকিৎসা হত। বহু রোগী আসতেন। এখন তার এই পরিস্থিতি। স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে। জঙ্গলমহল হাসছে, এই ভাঁওতাবাজি দিয়ে আর চলবে না।” সমালোচনা করেছে বামেরাও।
তবে বিরোধীদের অভিযোগ মানতে নারাজ শাসকদল। তৃণমূল পরিচালিত বাঁকুড়া জেলা পরিষদের সভাধিপতি অনুসূয়া রায় বলেন, “ভোট টানতে বিজেপি দৌড়ঝাঁপ করছে। আমাদের জঙ্গলমহল এখন হাসছে। এখন পরিবেশ ভালো আছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার নিয়োগ হচ্ছে। আশা করি, ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডাক্তার নিয়োগ হবে।”