
বাঁকুড়া: নিজস্ব ঘর থেকেও আবাসের তালিকায় জ্বলজ্বল করছে শাসক দলের পঞ্চায়েত প্রধান থেকে নেতাদের নাম। এমন ছবি এ রাজ্যে বিরল নয়। কিন্তু বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের রায়গড় গ্রামের সিং সর্দার পাড়ার কেউই সেই তালিকায় ঠাঁই পাননি। হতদরিদ্র পরিবারগুলি কেউ ছিটে বেড়ার দেওয়ালে ছেঁড়া ত্রিপল টাঙিয়ে বসবাস করছেন, কেউ বা প্রতি মূহুর্তে বাড়ি চাপা পড়ার আশঙ্কা নিয়ে দুরুদুরু বুকে আদ্যিকালের ভগ্নপ্রায় কুঁড়ে ঘরে বসবাস করছেন পরিবার নিয়ে। সরকারি প্রকল্পের অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা নিত্যদিন গ্রামবাসীদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে চোখের জলে। তবু রাজ্য সরকারের চোখে হাসতে থাকা জঙ্গলমহলের করুণ এই ছবি নিয়ে শাসক বিরোধী শিবিরের রাজনীতি চলছে সমানতালে।
বাঁকুড়ার রাওতোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের রায়গড় গ্রাম। গ্রামের আস্ত একটি পাড়া জুড়ে বাস আদিম জনজাতি সিং সর্দারদের। রয়েছে কিছু পিছিয়ে পড়া রায় পরিবারও। পাড়ায় ঢুকলেই চোখে পড়ে সার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভগ্নপ্রায় ছোট ছোট কুঁড়ে ঘর। এগুলোতেই হাড় কাঁপানো শীত হোক বা প্রবল রুক্ষ্ম গরম হলকা বাতাস বওয়া গ্রীষ্ম, পরিবার পরিজন নিয়ে কোনওরকমে মাথা গোঁজার আশ্রয় খোঁজেন গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারগুলি। বর্ষায় ভেঙে পড়া খড়ের চালা গড়িয়ে ভাসতে থাকে ঘরের মেঝে। তখন ঘরের এককোণে জড়ো হয়ে রাত জাগেন পরিবারের লোকজন।
অধিকাংশ ঘরে খড়ের চালায় নতুন খড় গোঁজা দেওয়ার সামর্থ নেই। কেউ কেউ ছেঁড়া ত্রিপল দিয়ে ঢাকা দিয়েছেন ভেঙে পড়া খড়ের চালার দৈন্য দশা। আবাস প্রকল্পের কথা জানেন গ্রামের সকলেই। সেই প্রকল্পে বাড়ির আবেদনও জানিয়েছেন অনেকে। আশপাশের গ্রামে কেউ কেউ আবাস প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন সে কথাও শুনেছেন রায়গড় গ্রামের সিং সর্দার পাড়ার সকলে। কিন্তু অজানা কারণে রায়গড় গ্রামের হতদরিদ্র পরিবারগুলির একজনের নামও ঠাঁই পায়নি সেই প্রকল্পের তালিকায়। অগত্যা বাড়ি চাপা পড়ার একরাশ আশঙ্কাকে সঙ্গী করে প্রতিটি রাতে ঘুমোতে যান বাসিন্দারা। নিজেদের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে কারও কারও বুক ফেটে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। চোখের জলে ভাসতে থাকে দুই গাল। কিন্তু জঙ্গলমহলের সেই কান্না পৌঁছায় না জঙ্গলমহলের হাসির শব্দে বিভোর থাকা জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সরকারি আধিকারিকদের কানে।
বাঁকুড়া জেলা পরিষদ সভাধিপতি অনুসূয়া রায় আবার ঘুরিয়ে বিজেপির দিকে আঙুল তুলছেন। কটাক্ষের সুরে তিনি বলছেন, “বিজেপি যতই বলুক শুধু আমাদের অনুগামীরা ঘর পাচ্ছে তা ঠিক নয়। ওরা তো একশোদিনের টাকা থেকে আবাসের টাকা সবই বন্ধ করে দিয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো সাধারণ মানুষের জন্য় বাংলার বাড়ির টাকা চালু করেছেন।” পাল্টা সিপিএমের রানীবাঁধ এরিয়া কমিটির সম্পাদক লক্ষ্মীকান্ত টুডু বলছেন, “ওরা বলছে জঙ্গলমহল হাসছে। কিন্তু ওদের চোখের জল কেউ মুছতে পারেনি। গরিব, খেয়ে-খাওয়া মানুষের দুর্দশা ঘোচেনি।”