Coochbehar: বড় দেবতাকে তো চেনেন, কোচবিহারের ৫০০ বছর ধরে পুজো হয় বড় দেবীর, কে তিনি জানেন?
রাজপুরোহিত হিরেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য এবং পুরোহিত দিনেন ভট্টাচার্য জানান, রাজ আমল থেকে চলে আসা প্রাচীন রীতি মেনেই প্রতিবছর এই আচার অনুষ্ঠিত হয়। নিয়ম-নিষ্ঠা এবং ঐতিহ্য বজায় রেখেই সম্পন্ন করা হয় গোটা পুজো ও কাঠামো স্থাপনের অনুষ্ঠান।

কোচবিহার: পাঁচশো বছরেরও বেশি সময়ের রাজ ঐতিহ্য। সেই রাজ আমল থেকে চলে আসা প্রাচীন রীতি মেনেই রাধাষ্টমীর পবিত্র তিথিতে সম্পন্ন হল কোচবিহারের ঐতিহ্যবাহী বড়দেবীর ময়না কাঠের পুজো। নিয়ম-নিষ্ঠা ও প্রাচীন আচার মেনে পুজো সম্পন্ন হল প্রথমে। তারপর সেই ময়না কাঠ স্থাপন করা হল বড়দেবীর কাঠামোয়। এই ময়না কাঠই বড়দেবীর প্রতিমার মূলদণ্ড। আগামী দিনে এই কাঠকে কেন্দ্র করেই ধীরে ধীরে নির্মিত হবে দেবীর পূর্ণাঙ্গ প্রতিমা।
কোচবিহারের রাজ পরিবারের অন্যতম প্রধান আরাধ্যা দেবী বড়দেবী। রক্তবর্ণা এই দেবীর পুজোকে ঘিরে রয়েছে একাধিক প্রাচীন রীতি, লোকবিশ্বাস এবং রাজ পরিবারের ইতিহাস।
কীভাবে শুরু বড়দেবীর পুজো?
কথিত আছে, কোচ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা বিশ্বসিংহ একসময় অসমের চিকনা জঙ্গলে শিকারে গিয়েছিলেন। সেখানেই একটি ময়না গাছকে দেবীরূপে খেলার ছলে পূজা করেন তিনি। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, দেবীর শক্তির প্রকাশ ঘটে এক অলৌকিক ঘটনায়। একটি খড় দিয়ে তাঁর এক সহচরের গলায় স্পর্শ করতেই তাঁর দেহ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়।
এই ঘটনার পর থেকেই দেবীর আরাধনা শুরু হয় বলে প্রচলিত বিশ্বাস। পরবর্তীতে মহারাজা বিশ্বসিংহের পুত্র মহারাজা নরনারায়ণ স্বপ্নে এক রক্তবর্ণা দেবীর দর্শন পান বলে কথিত আছে। সেই স্বপ্নাদেশের পরই দেবীর মূর্তি নির্মাণ করে শুরু হয় এই বড়দেবীর আরাধনা।
প্রাচীন সেই পরম্পরায় আজও বড়দেবীর প্রতিমা নির্মাণের আগে বিশেষ গুরুত্ব পায় ময়না কাঠ। ময়না কাঠ থেকেই প্রতিমার কাঠামো হয়। বড়দেবীর মন্দিরের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, ময়না কাঠের পুজো সম্পন্ন হওয়ার পর সেটিকে নির্দিষ্ট নিয়মে প্রতিমার কাঠামোয় স্থাপন করা হয়। এই কাঠই বড়দেবীর মূলদণ্ড হিসেবে বিবেচিত।
অর্থাৎ, আজকের এই আচার শুধু একটি পুজো নয়—এর মধ্য দিয়েই কার্যত শুরু হল আগামী বড়দেবীর প্রতিমা নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব।
রাজ আমলের রীতি আজও অক্ষুণ্ণ
রাজপুরোহিত হিরেন্দ্র নাথ ভট্টাচার্য এবং পুরোহিত দিনেন ভট্টাচার্য জানান, রাজ আমল থেকে চলে আসা প্রাচীন রীতি মেনেই প্রতিবছর এই আচার অনুষ্ঠিত হয়। নিয়ম-নিষ্ঠা এবং ঐতিহ্য বজায় রেখেই সম্পন্ন করা হয় গোটা পুজো ও কাঠামো স্থাপনের অনুষ্ঠান।
বড়দেবীর পুজোর সঙ্গে দীর্ঘদিনের বলি প্রথার ঐতিহ্যও জড়িয়ে রয়েছে। ফলে কোচবিহারের এই পুজো শুধু ধর্মীয় আচার নয়, রাজবংশের ইতিহাস ও স্থানীয় সংস্কৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
আজও আবেগের বড়দেবী
আনুমানিক ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোচবিহারের বড়দেবীর পুজোকে ঘিরে চলে আসছে নানা প্রাচীন রীতি ও ঐতিহ্য। সময় বদলেছে, রাজতন্ত্রের অবসান হয়েছে, কিন্তু বড়দেবীকে ঘিরে মানুষের বিশ্বাস ও আবেগে পড়েনি ভাটা।
রাধাষ্টমীর তিথিতে ময়না কাঠের পুজো এবং সেই কাঠের উপর বড়দেবীর প্রতিমা নির্মাণের সূচনা—আজও কোচবিহারের মানুষের কাছে তাই শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেদের শিকড়কে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার মুহূর্ত।
