
হুগলি: ডিঙি নৌকার ধারক বলা হয় বলাগড়কে। সেই বলাগড়ের মুকুটে যুক্ত হতে চলেছে নতুন পালক। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেই চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই আসতে পারে সুখবর। জিআই তকমা পেতে পারে বলাগড়ের নৌ শিল্প। খুশি নৌ শিল্পীরা। কিন্তু, তাঁদের জীবনে পরিবর্তন আসবে কি?
প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বছরের পুরনো বলাগড়ের এই নৌ শিল্প। শুরুর দিকে ডিঙি নৌকাই তৈরি হত বলাগড়ে।তাতে কোনও পেরেক ব্যবহার করা হত না। তার বদলে জোড় কাঠ (একটি কাঠের সঙ্গে অন্য কাঠ জোড়া) পদ্ধতি ব্যবহার করা হত। কিন্তু এখন জলুই পেরেক ব্যবহার করা হয়। নৌ শিল্পকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে রয়েছে এখনও বেশ কয়েকটি শিল্পী পরিবার। আগে ৪০টি পরিবার এই পেশায় যুক্ত ছিল। কিন্তু এখন তা কমে কুড়িটিতে এসে ঠেকেছে। নতুন প্রজন্মের ছেলেরা কেউ আগ্রহ না দেখালেও বাপ ঠাকুরদার এই শিল্পকে আঁকড়ে বেঁচে রয়েছে কয়েকজন। বর্তমানে এই শিল্প এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে।
শ্রমিকের মজুরি কম ও নৌকা বিক্রি আগের থেকে কমে যাওয়াতেই এই শিল্প থেকে হাত গুটিয়েছেন অনেকেই। একসময় দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন, নামখানা , কাকদ্বীপ সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে নৌকা তৈরির বরাত আসত। কিন্তু বর্তমানে সেই সংখ্যা অনেক কম। হাতেগোনা কয়েকজন এই শিল্পের সঙ্গে এখনও যুক্ত রয়েছেন।
নৌ শিল্পীরা বলছেন, ১৮ জানুয়ারি সিঙ্গুরের সভা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলাগড়ে বন্দর তৈরির কথা বলেছেন। তাতে কিছুটা আশার আলো দেখছেন তাঁরা। তার উপর বাড়তি পাওনা জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন)। জিআই তকমা পেলে আন্তর্জাতিক বাজারে নাম হবে, ব্যবসার পরিধি বাড়বে। বিভিন্ন জায়গা থেকে বরাত এলে নৌকা পাঠানো যাবে বলে মনে করছেন শিল্পীরা।
একসময় বলাগড় থেকে সপ্তগ্রাম যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল নৌকা। সপ্তগ্রামে ছিল বন্দর নগরী। ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নৌকার ব্যবহার ছিল। ব্যবসায়িক কাজ ছাড়াও যাতায়াত করা যেত ডিঙি নৌকার মাধ্যমে। এমনকি জলপথে ডাকাতরা ডাকাতি করতে যাওয়ার জন্য নৌকা কিনত। বলাগড়ের শ্রীপুর, রাজবংশীপাড়া, চাঁদরা, তেতুলিয়ায় রয়েছে নৌকার কারখানা। বহু পুরাতন এই নৌকা শিল্প এবার জিআই তকমা পেতে চলেছে। এমনই দাবি নৌশিল্পী ও বলাগড়ের আঞ্চলিক গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের। ২০২৩ সালে জিআই-এর জন্য আবেদন করা হয়। যার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০২২ সাল থেকে। প্রায় এক বছর ধরে চলে হেয়ারিং। আবেদন পত্র জমা দেন WBNUJS (ওয়েস্ট বেঙ্গল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ জুরিডিকাল সায়েন্স) এর ডক্টর পিনাকী ঘোষ। তিনিই মূল উদ্যোক্তা। গবেষণার জন্য তাঁকে সহায়তা করেছেন বলাগড় বিজয়কৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ের বাংলার শিক্ষক পার্থ চট্টোপাধ্যায়। ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে নৌ শিল্পীদের সমবায়। জিআই-র জন্য একাধিক ধাপ অতিক্রম করে ফেলেছে। আবেদনপত্র জমা, হেয়ারিং ও জিআই এর জার্নালে এই গবেষণাপত্র তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষক পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে জিআই ঘোষণা এখনও হয়নি। তবে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জিআই ঘোষণা হতে পারে। আদি নৌকা হল ডিঙি। যা একমাত্র বলাগড়ে তৈরি হয়। অন্য কোথাও কোনদিনও জোড় কাঠ পদ্ধতিতে নৌকো তৈরি হয়নি। এতে নৌকো অনেক মজবুত হত। বর্তমানে এই শিল্প এখন রুগ্ন। আগে বাবলা বা শালকাঠে নৌকো তৈরি হত। সেই কাঠেরও এখন অভাব রয়েছে। জিআই পেলে কি আর্থিকভাবে লাভ হবে ? গবেষক মনে করেন, আর্থিকভাবে কোনও লাভ হবে বলে তিনি মনে করেন না। তবে বলাগড়ের মুকুটে একটি নতুন পালক যুক্ত হবে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার যদি যৌথভাবে প্রাচীন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এগিয়ে না আসে তাহলে এই শিল্প বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে। তাই সরকারি সাহায্য দরকার এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে।
জিআই পেলে সুবিধা পেতে পারেন নৌকা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ীরা। এমনই মনে করছেন শিল্পী সঞ্জয় প্রামাণিক, কালীপদ বারিকরা। তাঁরা বলেন, “জিআই তকমা পেলে নৌকা আমরা সেল করতে পারব। এখানকার নৌকো যদি বিভিন্ন রাজ্যে যায় তাহলে আমরা উপকৃত হতে পারব। শুধু মাছ ধরার কাজে লাগবে এমনটা নয়, বিভিন্ন ট্যুরিজমেরে কাজে লাগবে। বিভিন্ন লেকে যদি নৌকো সরবরাহ হয় তাহলে আমাদের সুবিধা হবে। এর জন্য চাই সরকারি উদ্যোগ।”
নৌশিল্প সমবায়ের সহ-সভাপতি সহদেব বর্মন বলেন, “জিআই পেলে কী হবে আমরা এখনও কিছু বুঝতে পারছি না। কারণ, এর আগে আমরা সরকার থেকে কোনওরকম সহানুভূতি পাইনি। জিআই তকমা পেলে সরকার যদি আমাদের একটা মার্কেট তৈরি করে দেয়, তাতে যদি বাইরের ক্রেতারা আসে, তাহলে আমরা উপকৃত হব।”
হুগলির তৃণমূল সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “এটা পাবে তাতে আমি খুশি। এতে নৌশিল্পীদের সুবিধা হবে। কারণ তাঁদের সবসময় অবহেলার চোখে দেখা হত।”