
পুরুলিয়া: রাজ্যে সরকারি, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলগুলিতে পড়াশোনার বেহাল দশার ছবি প্রায়ই সামনে আসে। কোথাও শিক্ষক রয়েছে, পড়ুয়া নেই। কোথাও পড়ুয়া রয়েছে, শিক্ষক নেই। কোথাও আবার একজন শিক্ষকের কাঁধে ভর দিয়ে চলছে স্কুল। এই নিয়ে রাজ্য সরকারকে প্রায়ই নিশানা করে বিরোধীরা। এবার পুরুলিয়ার প্রাথমিক স্কুলগুলির চিত্র তুলে ধরে তৃণমূলকে আক্রমণ করল বিরোধীরা। পুরুলিয়ায় তিন শতাধিক স্কুল একজন মাত্র শিক্ষকের ভরসায় চলছে। কোথাও আবার শিক্ষকের অভাবে স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আবার পুরুলিয়ার এক নম্বর ব্লকে একটি উর্দু প্রাইমারি স্কুল বন্ধ নিয়ে চাপানউতোর বেড়েছে। ওই স্কুলে একজন শিক্ষক নিয়োগের পরও তাঁর বদলি নিয়ে শোরগোল পড়েছে।
আদালতের নির্দেশে পুরুলিয়া জেলাতে ২২১ জন প্রাথমিক শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগপত্র পেয়েছেন সম্প্রতি। তার মধ্যে একজনকে পুরুলিয়ার এক নম্বর ব্লকে একটি উর্দু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ করা হয়েছিল। সেখানে পাঠানো হয়েছিল একজন বাংলা মাধ্যমের শিক্ষিকাকে। ওই শিক্ষিকা স্কুল পরিদর্শন করে আসার পর রাতারাতি তাঁকে অন্য স্কুলে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে। আর তা নিয়েই শুরু হয়েছে চাপানউতোর। প্রশ্ন উঠছে, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের কাছে কি কোনও হিসাব নেই যে কোথায় কত উর্দু প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে? এই ভুল ইচ্ছাকৃত নাকি বোঝাপড়ার কারণে, সেই প্রশ্ন উঠছে।
পুরুলিয়া এক নম্বর ব্লকের ভান্ডারপুয়ারা বিএমসি উর্দু প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৪৮ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হয়। ভান্ডারপুয়ারা-চিপিদা গ্রাম পঞ্চায়েতের মোমেনডি গ্রামে প্রায় পাঁচ শতাধিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। সেখানকার শিশুরা এই উর্দু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। আড়াই বছর আগে বিদ্যালয়ের একমাত্র শিক্ষক অবসর নেওয়ার পর আর কোনও শিক্ষককে সেই স্কুলে পাঠানো হয়নি। যার ফলে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার একটি উর্দু প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
এখন একজন শিক্ষিকাকে নিয়োগ করেও তাঁর অন্য স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়া নিয়ে সরব হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের বক্তব্য়, গ্রামের উর্দু প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ফের শুরু হোক। কেউ বলছেন, সংখ্যালঘু তোষণের নাটক চলছে। গোটাটাই ভাঁওতা।” ওই এলাকায় গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য তৃণমূলের। শামিম আনসারি নামে তৃণমূলেরই ওই গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্যও চান, স্কুলটি ফের চালু হোক। রাজ্য সরকারের উন্নয়ন নিয়ে তাঁর বক্তব্য, “তাদের চিন্তাভাবনা দিয়ে হয়তো উন্নয়ন করছে। কিন্তু, আমাদের যে চিন্তাভাবনা সেটা নিয়ে তো ভাবা দরকার। শিক্ষার দিক থেকে উন্নয়ন হয়নি। অনেকদিন থেকে এই স্কুলটা বন্ধ রয়েছে। উর্দু নিয়ে আমাদের কালচার হয়তো বাদ দিতে চাইছে।”
২০২৩ সালের জুন মাসে ওই বিদ্যালয়ের একমাত্র শিক্ষক মহম্মদ আনজার হোসেন অবসর নিয়েছেন। সেই সময় ২০-২৫ জন ছাত্র-ছাত্রী ছিল। তারপর থেকে বন্ধ হয়ে গিয়েছে সেই স্কুল। আনজার হোসেনের কণ্ঠেও হতাশার সুর।
সম্প্রতি যে ২২১ জন নতুন শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগপত্র পেয়েছেন, তা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ তুলছে নিখিলবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। ABPTA-র জেলা সভাপতি জিতেন্দ্রনাথ ওঝা বলেন, “তিনশোর বেশি স্কুলে একজন মাত্র শিক্ষক রয়েছেন। আমরা ওইসব স্কুলে আরও শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানিয়েছিলাম। আমরা জানি, তৃণমূল যেখানে থাকবে, সেখানে দুর্নীতি হবে।” এর বিরুদ্ধে তাঁরা আদালতে যাবেন বলে হুঁশিয়ারি দিলেন।
বিজেপির প্রাথমিক শিক্ষা সংগঠনের নেতৃত্বও প্রশ্ন তুলেছে। বিজেপি নেতা জয়দীপ্ত চট্টরাজ বলেন, “বর্তমান সরকার সংখ্যালঘু সমাজকে ভাঁওতা দিচ্ছে। শিক্ষার মাধ্যমে উন্নয়ন ঘটানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা নেই। কারণ, সরকার জানে শিক্ষার মাধ্যমে চেতনা জাগলে আর ভুল পথে চালিত করা যাবে না। ”
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি রাজীব লোচন সরেন বলছেন, ওই স্কুলে কোনও ছাত্র-ছাত্রী নেই। তাই নেই কোনও শিক্ষক শিক্ষিকা। এবং এটাও মেনে নিয়েছেন, ২২১ জনের তালিকাতে কোনও উর্দু শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ হয়নি। তিনি আশ্বাস দেন, “অভিভাবকরা আগ্রহ দেখালে তখন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। উর্দু মাধ্যমের স্কুলে একজন বাংলা মাধ্যমের শিক্ষিকাকে কেন পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল? রাতারাতি কেনই বা তাঁকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হল?