
কোনও রাখঢাক নেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার তেলের ‘দখল’ নেওয়াই আসল লক্ষ্য। আর তার ফলে এটাও স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় কেন বোমাবর্ষণ চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করল। এই ঘটনায় একদিকে যেমন তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে, অপরদিকে প্রশংসাও শোনা যাচ্ছে নানা মহল থেকে। ফ্লোরিডার এক সাংবাদিক সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে আমেরিকার ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বিস্ময়কর, কার্যকর এবং শক্তিশালী সামরিক ক্ষমতার প্রদর্শন’ বলে অভিহিত করেন। ২০১১ সালে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে খতম করার অভিযানের চেয়েও বেশি আলোচ্য এই ‘মিশন ভেনেজুয়েলা’!
মার্কিন মিশনের পরেই ৬৩ বছর বয়সি মাদুরোকে অপহরণের খবর বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের শীর্ষ শিরোনামে চলে আসে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের সঙ্গে মাদুরোর জড়িত থাকার অভিযোগ বারংবার করে এসেছে মার্কিন প্রশাসন। আর সেই লক্ষ্যে মাসের পর মাস হুমকি-হুঁশিয়ারির পর ট্রাম্প ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে। মাদক পাচারে অভিযুক্ত বলে দাবি করা নৌযানে একাধিক প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় আমেরিকা। এসব হামলায় ১০০-র বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে অভিযোগ, এহেন হামলার বৈধতা নিয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জ ও আন্তর্জাতিক আইনি বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন।
মাদুরোকে গ্রেফতারে সহায়তার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৫ কোটি ডলার পর্যন্ত পুরস্কারের ঘোষণা করে। তলে তলে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সামরিক অভিযান চলাকালীন, মার্কিন গোয়েন্দারা মাদুরোর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিল এবং বিশেষ বাহিনী গোপনে তাঁকে গদিচ্যুত করার ছক কষছিল! যদিও একটি দেশের প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা থেকে সরানো তো আর বাচ্চার হাতের মোয়া নয়! আর এখানেই এক মোক্ষম ছক কষেন ট্রাম্প।
‘অ্যাবসোলিউট রিজলভ’ নামের এই অভিযানটি কয়েক মাস ধরে নিখুঁতভাবে অনুশীলন করা হয়েছিল বলে জানান জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন।
ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাফ জানিয়েছিলেন যে, অভিযানের আগে মাদুরোর বাড়ির হুবহু আদলে একটি ইস্পাতের ভবন তৈরি করে সেখানে অনুশীলন করেছিল আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী ও ক্লাসিফায়েড বাহিনী Delta Force। এছাড়াও এই অভিযানে যুক্ত ছিল 160th SOAR অর্থাৎ, Special Operations Aviation Regiment)—এরা বিশেষভাবে রাতের অভিযানে পারদর্শী এবং Chinook, Black Hawk ও Little Bird-এর মতো ক্ষমতাশালী হেলিকপ্টার ব্যবহারে দক্ষ।
এখানেই শেষ নয়! গুপ্তচররা কীভাবে কাজ করেছিলেন জানেন? Reuters-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, CIA-র একটি ছোট দল গত বছরের অগস্ট থেকেই ভেনেজুয়েলায় সক্রিয় ছিল। তারা মাদুরোর দৈনন্দিন চলাফেরা ও অভ্যাস অর্থাৎ ওই যাকে বলে pattern of life, সে সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জোগাড় করে। CIA-র এমন একজন ‘asset’ও ছিল, যিনি মাদুরোর খুব কাছের মানুষ এবং তাঁর অবস্থান রিয়েল টাইমে জানাতেন ট্রাম্পকে। ভাবতে পারেন? সব খবর হাতে। সব প্রস্তুতি শেষ। মার্কিন সময় অনুযায়ী শুক্রবার রাত ১১টা ৪৬ মিনিট আর ভারতীয় ঘড়ি অনুযায়ী সময়টা শনিবার ভোর ৩টা ৪৬ মিনিট। এই ব্রহ্মমুহূর্তে অভিযানের চূড়ান্ত অনুমোদন দেন ডোনাল্ড!
এই অভিযানে ২০টি এয়ারবেস থেকে প্রায় ১৫০টি বিমান অংশ নেয়। কোন কোন মারাত্মক শক্তিশালী বিমান অভিযানে ছিল জানেন? B-1 Lancers, F-22 Raptors, F-35 Lightning II, F/A-18 Super Hornets, EA-18 Growlers,এবং E-2 Hawkeyes। এছাড়াও ব্যবহৃত হয় অত্যন্ত গোপনীয় RQ-170 Sentinel drone—যাকে ‘Wraith’ বা ‘The Beast of Kandahar’ নামেও ডাকা হয়। এই স্টেলথ ড্রোন মূলত নজরদারি, গোয়েন্দাগিরি এবং টার্গেট শনাক্তকরণের কাজে ব্যবহৃত হয়। অভিযানের অংশ হিসেবে প্রথমেই ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করা হয়। এক্ষেত্রে ট্রাম্প বলেন যে বিশেষ মার্কিন প্রযুক্তির ব্যবহার করে কার্যত কারাকাসের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। যদিও কোন প্রক্রিয়ায় এই অসাধ্যসাধন হল, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মার্কিন বাহিনী প্রবেশ করতেই শুরু হয় ধ্বংসের খেলা। কারাকাসজুড়ে একের পর এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
শনিবার রাত ২টা ১ মিনিটে মার্কিন হেলিকপ্টার মাদুরোর বাসভবনে অবতরণ করে এবং তাঁকে ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে হেফাজতে নেয় আমেরিকা। এই সময় কোনও গুলির লড়াই হয়েছিল কি না, বা কোনও প্রতিরোধ ছাড়াই তাঁদের আটক করা হয়েছিল—সে বিষয়ে এখনও কিছু জানানো হয়নি। এরপর কাট টু সকাল ৪টা ২৯ মিনিট, মাত্র আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই, মাদুরোকে একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীতে তোলা হয় এবং সেখান থেকে নিউইয়র্কের উদ্দেশে রওনা দেওয়া হয়। পরে ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে মাদুরোর একটি ছবি পোস্ট করেন, যেখানে তাঁকে চোখ বাঁধা অবস্থায় ধূসর ট্র্যাকস্যুট পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ নিউইয়র্কের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বেসে মাদুরোকে নিয়ে মার্কিন বিমান অবতরণ করে। এখানে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীটির নাম হল USS Iwo Jima, এটি বিশাল amphibious assault ship, যা অনেকটা ছোট আকারের aircraft carrier-এর মতো কাজ করে। এই জাহাজের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৪০ ফুট এবং ফ্লাইট ডেকের প্রস্থ ১৪০ ফুট। এখানে Marines, হেলিকপ্টার, জেট ও নৌযান সহজেই বহন করা যায়। সমুদ্র থেকে সরাসরি স্থলে সেনা নামানোর জন্যই এই জাহাজের নাম এমন উভচর-ঘেঁষা। কেমন টানটান থ্রিলার সিনেমার মতো লাগল না গোটাটা?