জেল খেটেছেন যৌবনে, বিপ্লবী থেকে কীভাবে ইরানের সুপ্রিম লিডার হয়ে উঠছিলেন খামেনেই?

Ayatollah Ali Khamenei: খামেনেইয়ের উত্থান একেবারে মাটি থেকে হয়েছিল। ১৯৬০-৭০-এর দশকে তিনি শাহ মহম্মদ রেজা পাহলভির বিরোধিতা করেন। আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির বিপ্লবী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এই সময় বেশ  কয়েকবার কারাবন্দিও হন খামেনেই।

জেল খেটেছেন যৌবনে, বিপ্লবী থেকে কীভাবে ইরানের সুপ্রিম লিডার হয়ে উঠছিলেন খামেনেই?
আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই।Image Credit source: PTI

|

Mar 01, 2026 | 1:43 PM

তেহরান: ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে বিরাট সাফল্য আমেরিকা-ইজরায়েলের। সংঘাত শুরুর সময় থেকেই প্রধান টার্গেট ছিলেন ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগেই খামেনেই ও তার ছেলেদের নিকেশের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে খবর। শেষে সেই সংঘাত শুরু হল। ইজরায়েল-আমেরিকার যৌথ অভিযানে প্রথমেই খামেনেইকে নিকেশ করা হল। আজ, রবিবার (১ মার্চ) ইরান জানায় যে সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মেয়ে, জামাই, নাতি ও পুত্রবধূরও মৃত্যু হয়েছে আমেরিকা-ইজরায়েলের হামলায়।

খামেনেইয়ের মৃত্যুতে ইরানে ৭ দিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ৪০ দিন রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হবে। শোনা যাচ্ছে, খামেনেইয়ের অবর্তমানে আপাতত দায়িত্ব সামলাবেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েস্কিয়ান ও আইনসভার দুই সদস্যের কাউন্সিল দেশ সামলাবেন। শীঘ্রই পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা বাছাই করা হবে। খামেনেইয়ের মৃত্যুতে একদিকে যেখানে শোকের ছায়া নেমেছে, তেমনই অনেক ইরানবাসীকে আবার উদযাপনও করতে দেখা গিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে ‘ইতিহাসের সবথেকে শয়তান মানুষ’ বলে উল্লেখ করেছেন। আসলেই কি শয়তান? কেন তাঁকে ঈশ্বরের স্থানে বসিয়েছিল সবাই?

খামেনেইয়ের পরিচয়-

আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেইয়ের জন্ম ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল। ইরানের মাশহাদের এক ধর্মীয় পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। শিয়া ইসলামিক চিন্তাধারা ও শিক্ষায় বড় হয়েছিলেন খামেনেই। পরে ইসলামি শিক্ষা নেন। ধর্মীয় পাঠ থেকে ফিকহ বা ইসলামী আইনে নিজেকে শিক্ষিত করেন।

রাজনৈতিক উত্থান-

খামেনেইয়ের উত্থান একেবারে মাটি থেকে হয়েছিল। ১৯৬০-৭০-এর দশকে তিনি শাহ মহম্মদ রেজা পাহলভির বিরোধিতা করেন। আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির বিপ্লবী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এই সময় বেশ  কয়েকবার কারাবন্দিও হন খামেনেই।

ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব-এর পর খামেনেই বিপ্লবী কাউন্সিলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং ইরানের নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ভূমিকা পেতে শুরু করেন।

বিপ্লবের পরে ১৯৮১ সালে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৫ পর্যন্ত এই দায়িত্বে থাকেন। এই সময় তিনি বিপ্লব-পরবর্তী সংগ্রাম, ইরান-ইরাক যুদ্ধ এবং দেশীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।

সুপ্রিম লিডার হওয়া:

১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠাতা নেতা আয়াতোল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর, সংবিধান ও ধর্মীয় বিশেষ পরিষদ (Assembly of Experts) তাকে ইরানের সুপ্রিম লিডার বা সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে নির্বাচিত করে। সে সময় তাকে এই দায়িত্বে আনতে সংবিধানে কিছু সংশোধনী করা হয়, কারণ তিনি তখন শিয়া ধর্মে সর্বোচ্চ শাস্ত্রীয় মর্যাদা (মারজা) ছিলেন না।

দেশ শাসন ও ক্ষমতার ব্যবহার-

সুপ্রিম লিডার হিসেবে খামেনেই ইরানের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোর সর্বোচ্চ ক্ষমতা ছিলেন। তাঁর হাতে নিম্নলিখিত এই ক্ষেত্রগুলিতে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ছিল-

  • ইরানের সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষত ইসলামিক রেভোলিউশনরি গার্ড কর্প (IRGC)
  • নীতিনির্ধারণ ও কূটনীতি
  • বিচার ব্যবস্থা ও গণমাধ্যম
  • আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কৌশল

খামেনেই প্রেসিডেন্ট, সংসদ বা অন্য নির্বাচিত কর্মকর্তাদের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী ছিলেন।

নীতি ও রাজনীতি-

ইরানের কূটনৈতিক নীতি কঠোর রাখা, বিশেষত পশ্চিমী দেশ বিশেষ করে আমেরিকা ও ইজরায়েলের প্রতি বিরোধী অবস্থান বজায় রেখেছিলেন। ইরানের আঞ্চলিক নীতি-ব্যবস্থায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থক গোষ্ঠীকে সমর্থন করত ইরান। লেবাননের হিজবুল্লাহ, হুথি থেকে শুরু করে ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেনের শিয়া সংগঠনগুলিকে সমর্থন করতেন।

বিতর্ক-

খামেনেইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনেক বিতর্কও হয়েছে। কট্টরপন্থী শিয়া মুসলিম খামেনেই দেশ শাসনেও কঠোর নীতি গ্রহণ করতেন। বিক্ষোভ-আন্দোলন কঠোর হাতে দমন-পীড়নের অভিযোগ ছিল। ২০০৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জালিয়াতি ও দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে।

এরপরে ২০২২-২৩ সালে ইরান জ্বলে ওঠে হিজাব বিরোধী আন্দোলনে। হিজাব পরা নিয়ে কড়া আইন এবং সেই আইন ভঙ্গ করার অপরাধে মাহসা আমিনির মৃত্যু যেন সেই বিক্ষোভের আগুনে আরও ঘৃতাহুতি দেয়। খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে কঠোর হাতে, অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে আন্দোলনকারীদের দমন করার।

পাশাপাশি খামেনেইয়ের আমলে ইরানের হিজবুল্লা, হুথির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমি দুনিয়ার সঙ্গে টানাপোড়েন শুরু হয়। ২০১৫ সালে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA) স্বাক্ষরিত হলেও ২০১৮ সালে আমেরিকা এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায়।