
রাত পোহালেই বাংলাদেশে ভোট। সতেরো মাসের টালবাহানা কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত যে ভোটটা হচ্ছে, এটাই অনেক। একটা সময় তো বাংলাদেশের ভিতরেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছিল যে আদৌ নির্বাচনটা হবে তো? এই প্রশ্ন ওঠার যথেষ্ট কারণও মজুত ছিল। কারণগুলো এখন আর নেই, এমনটা নয়। ভরপুর আছে। বরং পরিস্থিতি এখন অন্য মাত্রায় ঘোরালো। প্রশ্ন একটাই, তা হল ভোটটা কেমন হবে এবং ভোটের ঠিক পরই কি বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা হাতে নিতে পারবে?
এই যে সংশয়টা তৈরি হচ্ছে তার পিছনে অনেকগুলি কারণ রয়েছে। পার্লামেন্ট ইলেকশনের সঙ্গেই রেফারেন্ডাম বা গণভোট হবে বাংলাদেশে। এই গণভোটটা হল সংবিধান সংশোধনের গণভোট। এই গণভোটে যদি জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধানের ৮৪টি সংশোধনের পক্ষে মানুষ রায় দেয় তাহলে হয়ত নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া তৎক্ষণাত থামিয়ে দেওয়া হতে পারে। পুরো প্রক্রিয়াটা চলে যেতে পারে বিশ বাঁও জলে। সেক্ষেত্রে বলা হতে পারে, আগে সংবিধান সংশোধন পরিষদ গঠন করে যাবতীয় সংস্কার বাস্তবায়িত করা হোক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে। তারপর নির্বাচিত সরকার ক্ষমতা হাতে নেবে। আর সেটা যদি হয়, তাহলে ইউনূস সরকারই ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে বেশ কয়েক মাস। আর এই অনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যে নতুন টালবাহানা তৈরি হবে না তা কী করে নিশ্চিতভাবে বলা যায়? তবে, এমনটা বলা হলেই যে সব রাজনৈতিক পক্ষ তা সহজেই মেনে নেবে তা হয়ত নয়। তবে বেগ পেতে হবে বাংলাদেশকে। বেগ পেতে হবে ১৮ কোটি বাঙালিকে।
আরেকটা সম্ভবনাও উঠে আসছে। ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে যে ভোট হবে তা কতটা নিরপেক্ষ হবে? কারণ, ইতিমধ্যে গণভোটের বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকার ঘোষিতভাবে পক্ষ নিয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে, দেশের প্রশাসন অর্থাৎ যাঁরা ভোটটা পরিচলনা করবেন সেই সরকারি আমলা ও কর্মীদের মধ্যে নাকি রাজনৈতিক প্রভাব অত্যন্ত বেশি। তাই পক্ষপাতিত্বের ভয় থাকছেই।
তাছাড়া, যে ভাবে বাংলাদেশের পুলিশ কার্যকারিতা হারিয়েছে এবং সেনাবাহিনীও যে বিরাট পেশাদারিত্বের সঙ্গে সবটা সামলাতে পারবে সেই ভরসাও করা যাচ্ছে না। কারণ, ইতিমধ্যে অসংখ্য মব সন্ত্রাস বা সংখ্যালঘুদের উপর অকথ্য অত্যাচারের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বা সেনাকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। তাই ১২ তারিখের ভোটে যদি গণ্ডগোল হয়, পুলিশ-সেনা মিলে পারবে তো সামলাতে? ভোট গ্রহণ, ব্যালট বাক্স সংরক্ষণ, ভোট গণনা সব ঠিকঠাক হবে? প্রশ্ন উঠছে…
এর বাইরে, ভোট কারচুপির হাতে গরম খবর এসেছে দু-তিন দিন আগেই। লক্ষ্মীপুর থেকে ভোটের অবৈধ ৬টি সিল উদ্ধার হয়েছে। প্রেসের মালিক গ্রেফতার হয়েছেন এবং তিনি জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তাঁকে এইগুলি বানাতে নির্দেশ দিয়েছিল জামাত নেতা সৌরভ হোসেন ওরফে শরীফ। ঘটনা সামনে আসতেই এই সৌরভকে আবার বহিষ্কার করেছে জামাত। দলের ভাবমূর্ত্তি নষ্ট করার জন্যই এমন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ। জনাব সৌরভ অবশ্য এখন পলাতক! তার মানে, ভোট জালিয়াতি নিয়ে আশঙ্কা থাকছেই…
এবার একটা অন্য সম্ভবনার দিকে আসা যাক, ধরা যাক ভোট মোটের উপর হয়ে গেল। কিন্তু সংসদ হয়ে দাঁড়াল ত্রিশঙ্কু। তখন কী হবে? উত্তর নেই। ইতিমধ্যে জামাতের আমির অর্থাৎ জামায়েত ইসলামির সর্বোচ্চ পদাধিকারী ডাঃ শফিকুর রহমান বিএনপি(BNP)-র চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করে জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়ে প্রাক-কথা বলে এসেছেন। তারেক কিন্তু তা পত্রপাঠ খারিজ করে দেননি তখন। সম্প্রতি অবশ্য রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক জাতীয় সরকারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন। আসলে ভোট সামনে তো, তাই এখন জাতীয় সরকারের কথা বললে জামাত বিরোধী ভোট তো আর ঝুলিতে ঢুকবে না। তাই সেই সম্ভবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে তখন তৈরি হবে বিএনপি-জামাত-এনসিপি-র মিলিঝুলি সরকার। আর এমন সরকার হলে যে তা এক পা এগোতে গিয়ে পাঁচ পা পিছবে- তা অনুমান করাই যাচ্ছে।
এবার ধরা যাক, বাংলাদেশের ভোট একেবারে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হল। ডঃ প্রফেসর মহম্মদ ইউনূস কথা দিয়েছেন যে এবারের ভোট হবে ইতিহাসের সেরা ভোট। ধরা যাক, তাই হল। এবং ক্লিয়ার ম্যানডেট নিয়ে একটি সরকার তৈরি হল। কিন্তু সেই সরকার কতটা কাজ করতে পারবে?
একদিকে, ইউনূস সরকার আমেরিকার সঙ্গে নন ডিসক্লোজার চুক্তি করে ফেলেছেন। অর্থাৎ, কী কী বিষয়ে যে তিনি চুক্তি করেছেন তা দেশের মানুষ জানেই না। আর তা জানানোও যাবে না। কিন্তু যে সরকার আসবে, তাদের তা অক্ষরে অক্ষরে মানতে হবে। আর অন্যদিকে, জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে তো একগাদা বিধি নিষেধের মধ্যে দিয়ে হাঁটতেই হবে নির্বাচিত সরকারকে। ফলে, পরিস্থিতি খুবই জটিল।
তবে সব জটিলতাই অনেকটা কাটতে পারে যদি এবারের নির্বাচনে সুস্পষ্ট জনমত পায় কোনও একটি জোট। কারণ, ক্লিয়ার ম্যানডেট বেজায় জিনিস। গণতন্ত্রে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন থাকলে পাহাড় ডিঙানোও সম্ভব।
কিন্তু, সেটা কি সম্ভব? দেখে নেওয়া যাক বাংলাদেশের ভোটের বাজারের টাটকা ছবিটা-
বাংলাদেশে মোট আসন ৩০০। আর মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫। এবার লড়াই মূলত বিএনপি জোট বনাম জামাতে ইসলামির জোটের মধ্যে। কারণ, আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে মাঠে থাকতে পারছে না।
মোট ভোটার: ১২.৭৭ কোটি
পুরুষ ভোটার: ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার
নারী ভোটার: ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার,
তৃতীয় লিঙ্গ ভোটার: ১,১২০ জন
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ভোটের ময়দানে না থাকা মানে যে সরাসরি অ্যাডভান্টেজ বিএনপি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু, গত ১৭ মাসে পদ্মা-মেঘনা দিয়ে যে অনেক জল বয়ে গিয়েছে, তাই ঠিক ২০২৪ সালের অগস্টের পরপরই যতটা বুক ঠুকে অ্যাডভান্টেজ বিএনপি বলা যাচ্ছিল তা এখন আর অতটা প্রত্যয়ের সঙ্গে বলা যাচ্ছে না। তবু বিএনপি তুলনায় কেন অনেকটাই এগিয়ে আছে কেন, সেটাই দেখা যাক-
প্রথম কথা, ইতিহাস ও পরম্পরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যেমন জাতির পিতা। তেমনই শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষক। স্বাধীন বাংলাদেশকে সব থেকে বেশি দিন শাসন করেছে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ও জিয়াউর রহমানের BNP-ই। আওয়ামী লীগ যেমন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের ঐতিহ্য ও পরম্পরা বলে মনে করে, BNP-ও ঠিক তাই। অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা BNP-তেও ছিলেন বা এখনও কয়েকজন রয়েছেন। তাই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরম্পরার প্রশ্নে আওয়ামী লীগহীন নির্বাচনী ময়দানে BNP-বাকিদের থেকে অনেক এগিয়ে।
দ্বিতীয়ত, সংগঠন। উপমহাদেশে ভোট জিততে গেলে লাগে সংগঠন। আর সেই সংগঠন ক্ষমতায় থাকলে যথেষ্ট পোক্ত হয়। জিয়াউর রহমানকে ধরলে BNP মোট ৩ দফায় বাংলাদেশ শাসন করে ফেলেছে। ফলে, একেবারে তৃণমূল স্তর পর্যন্ত যেমন তাঁদের সংগঠন রয়েছে তেমনই রয়েছে কঠিন পরিস্থিতিতে দেশ শাসনের অভিজ্ঞতা।
একথা ঠিক যে বহুদিন তারা ক্ষমতায় নেই এবং আওয়ামী লীগ আমলে যথেষ্ট কোণঠাসা হয়ে ১৫টা বছর কাটাতে হয়েছে। কিন্তু, আওয়ামী লীগ বিদায় হতেই বাংলাদেশ জুড়ে সর্বত্র BNP-র নেতাকর্মীরা নতুন প্রাণশক্তিতে পুরানো মূর্তি ধারণ করেছেন। তাছাড়া, দেশ শাসনের অভিজ্ঞতা থাকার দিক থেকে BNP এবারের ভোটে ভোটেরারে চোখে বাকিদের থেকে অনেক বেশি ভরসাযোগ্য মনে হতে পারে।
এবার আসা যাক, জোটের কথায়। বিএনপি মানে কিন্তু কুড়ি দলের জোট। এই ২০ দলের জোট বলে আবার নির্বাচনী আসন সমঝোতা ভাববেন না। বরং, মতাদর্শগত জোট। বিএনপি এমনিতে একটি মধ্যপন্থী দল। আর বহু দিন ধরে শীত-গ্রীষ্ম্য-বর্ষা এই শরিক দলগুলিকে সঙ্গে নিয়েই রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে তারেক জিয়ার দল। তাই সমর্থনের বেসটা অনেক বেশি পোক্ত। আর এখানে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপারও আছে। BNP-র সঙ্গী দলগুলির মধ্যে কয়েকটিকে বাদ দিলে বাকিদের তেমন একটা মাঠে ময়দানে দেখতে পাওয়া যায় না। ফলে, আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে স্টিয়ারিং হুইলে সদাসর্বদা BNP-ই থাকে। ছিঁটেফোঁটা কয়েকটা আসন দেওয়া হয় শরিকদের। এবারেও সংখ্যাটা দেখলেই বুঝবেন- ৩০০টির মধ্যে ২৮৮টি আসনে নিজের প্রতীক মানে ধানের শীষ নিয়ে লড়ছে রাতের জিয়ার দল। আর মাত্র ১২টি আসন তারা ছেড়েছেন ১৯টি শরিক দলের জন্য, তাহলেই বুঝুন। তার মানে, সর্বোচ্চ আসনে লড়বে BNP কিন্তু, সমর্থন জোগাড় করবে শরিক দলের ভোট বেসের বড় অংশের থেকে।
জুলাই-অগস্টে যেসব ছাত্রনেতারা সামনের সারিতে উঠে এসেছিলেন তাঁরা কেউ কেউ ইউনূস সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন, আবার অনেকে সরকারে না থেকেও হাতে মাথা কাটতেন। পরে এরাই ন্যশনাল সিটিজেনশিপ পার্টি (NCP)- তৈরি করলেন। বিগত সতেরো মাসে এইসব নেতাদের অনেকেরই নানা কীর্তি সামনে এসেছে এবং তাঁদের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ধাক্কা খেয়েছে। এই সব নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করলেও শেষ পর্যন্ত NCP-র সঙ্গে আসন সমঝোতায় যায়নি BNP। ফলে, BNP-র কাঁধে এবার ইসলামি সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ম্যাসকট জামাতের বোঝাও যেমন নেই তেমনই নেই NCP-র বোঝা।
লাস্ট পয়েন্ট বাট নট দ্য লিস্ট। আওয়ামী ও সংখ্যালঘু হিন্দু-বৌদ্ধ ভোট। আওয়ামী লীগাররা অনেকেই এবার ভোট দেবেন না। আবার স্থানীয় চাপে অনেককে ভোট দিতেও হবে। এই ভোটটা অধিকাংশ ক্ষেত্রে BNP-র ঝুলিতে ঢুকবে বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ, আওয়ামী লীগের কার্যকলাপে নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে নৈতিক সমর্থন ছিল না BNP-র। তাছাড়া, BNP-র মতো মূল স্রোতের মধ্যপন্থী দল ক্ষমতায় এলে আওয়ামি লীগের প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ বাড়বে। একইভাবে, বিগত ১৭ মাসে বাংলাদেশে যেভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সংখ্যালঘুরা তাতে তাদেরও একটা অংশ ভোট দিতে যাবে না। আর যারা যাবেন, তাদের বেশিরভাগই BNP-কে ভোট দেবেন। কারণ, এবারের BNP কিন্তু আর জামাতের দোসর নয় বরং ঘোরতর প্রতিপক্ষ।
গোটা বাংলাদেশজুড়ে ইদানিং সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির হাওয়া বেশ গতি পেয়েছে। এই হাওয়াই এবারের ভোটে জামাত-সহ যাবতীয় ইসলামি দলগুলির জোটের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো BNP-র পাল থেকে কিছুটা হাওয়া কাড়তে পারে।
আওয়ামী লীগের পতন ঘটানোর পর থেকেই বাংলাদেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মহানগর – সর্বত্র বিভিন্ন স্তর থেকে অন্যায্যভাবে টাকা তোলা যাকে ওই দেশে চাঁদাবাজি বলা হয় সেই অভিযোগ উঠেছে BNP-র বিরুদ্ধে। ব্যাপারটা এতটাই অস্বস্তিকর পর্যায়ে পৌঁছেছে যে দলের থেকে অনেককে তাড়ানোর দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হয়েছে তারেক রহমানকে। কিন্তু, তাতে যে তেমন কিছু লাভ হয়নি সেটাও সত্য। অনেকেই বলছে, ছোট নামদের ছাঁটা হয়েছে, চাঁদাবাজিতে যারা আসল পালের গোদা তারা এখনও BNP দফতরগুলো আলো করে বসে আছেন আজও।
এছাড়া, বড় দলের ভিতরে যা হয় তা BNP-তেও হচ্ছে। অর্থাৎ, গত ১৫ বছর লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না পেয়ে নির্বাচনে অংশ না নিতে পেরে BNP-র ক্ষুধার্ত নেতারা অনেকেই টিকিট প্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু, সবার ভাগ্যে তো আর সিঁকে ছেঁড়েনি। তাই তারা নির্দল মানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে এবারের ভোটে লড়বেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই BNP প্রার্থীদের বিপদে ফেলবেন বলে মনে করা হচ্ছে। এই জল যে শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়াবে তা এখনই বলা মুশকিল।
এর বাইরে আরেকটা মহা বিপদ রয়েছে তারেক জিয়ার দলের। সেটা হল, অধিকাংশ BNP প্রার্থীরা আওয়ামী লীগহীন এবারের নির্বাচনে নিজেদের জয়ের ব্যাপারে এতটাই নিশ্চিত হয়ে গিয়েছেন যে পর্যন্ত এই ওভার কনফিডেন্সই না কাল হয়ে দাঁড়ায়…
এবার আসা যাক জামাতের বিষয়ে। বাংলাদেশ জামায়েতে ইসলামি এবার ১১ দলের একটি জোট হিসাবে ভোটে লড়ছে। বাংলাদেশের প্রায় সব কটি ইসলামি দলই জামাতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। আর সঙ্গে আছে NCP কোমর বেঁধেছে।
দেখুন, অতীতের রেকর্ড বলছে জামাত একা ভোটে লড়লে ৫-৭টার বেশি আসনের প্রত্যাশা না করাই ভাল। কিন্তু, এবার তাদের বড় শরিক NCP, যাঁরা জুলাই বিপ্লবের দল। আর এর সঙ্গে রয়েছে অনেকগুলি ছোট ছোট কিন্তু বিভিন্ন পকেটে শক্তিশালী ইসলামি দল। তার উপরে দেশের পরিস্থিতিও ঘোলাটে। ফলে, জামাত জোট এবার ঠিক কেমন আসন জোগাড় করবে তা বলা যাচ্ছে না বুক ঠুকে।
আসলে জামাতের কয়েকটা বিশেষ সুবিধা রয়েছে। প্রথমত, তারা বলছে, আওয়ামী লীগকে দেখেছেন। BNP-কেও দেখেছেন। এবার একবার আমাদের সুযোগ দিন। অর্থাৎ, তারা পরীক্ষিত নয় বলেই সম্ভাবনাময়- এমনটাই বলতে চাইছে।
তাছাড়া, জামাতের সংগঠন সারা দেশে না থাকলেও যতটুকু রয়েছে তা খুবই ওয়েল ওয়েলড। ইলেকশন মেশিনারির দিক থেকেও জামাত বেশ ঝকঝকে।
এর বাইরে, হাসিনার পতনের পর থেকে বাংলাদেশে মুসলিম সাম্প্রদায়িক রাজনীতির একটা অনুকুল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এর পিছনে জামাতের কৃতিত্বও যেমন রয়েছে, তেমনই এর ফসলও তুলবে এবার জামাত, এমনটাও মনে করা হচ্ছে।
আর বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনে নাকি জামাতের প্রভাব নিরঙ্কুশ। আর সেটা যদি ঠিক হয় এবং ঠিক ভাবে কাজ করে তাহলে তো কথাই নেই।
কিন্তু, জামাতের জন্য চাপের দিকও রয়েছে বেশ কয়েকটা।
প্রথমত, জমাত মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানপন্থী ছিল। এ তাদের ঐতিহাসিক দায়। একাত্তরের গণহত্যায় জামাতের ভূমিকা প্রবলভাবে সমালোচিত। তাই স্বাধীনতার পক্ষের মানুষদের ভোট তেমন একটা জামাত পাবে না।
দ্বিতীয়ত, BNP-র সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো সংগঠন তো তাদের নেই।
আর, সব থেকে বড় কথা, দীর্ঘকাল ধরে উগ্র ইসলামি রাজনীতি করে আসার জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিশেষত ওয়েস্টার্ন ওয়ার্লডে জামাতকে ভাল চোখে দেখা হয় না। যদিও নানা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে জামাত এখন নিজেদের মডারেট প্রমাণ করতে চাইছে, তবে তাতে তেমন কাজ কি হবে?
এ ক্ষেত্রেও লাস বাট নট দ্য লিস্ট, নারী শক্তি। জামাত তত্ত্বগতভাবে নারী বিরোধী বলে প্রচার। এবার একজন মহিলাকেও তারা টিকিট দেয়নি। অথচ বাংলাদেশে প্রায় অর্ধেক ভোটারই নারী। এই নারী ভোট কতটা উঠবে জামাতের দাড়িপাল্লায়? ফলে, বুঝতেই পারছেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। তাই ভোট কেমন হবে? আর ভোটের পরেই বা ঠিক কী হবে সেদিকেই তাকিয়ে থাকতে হবে…