
ভেনেজুয়েলায় রাতের অন্ধকারে অভিযান চালিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে তুলে এনেছেন আমেরিকায়। নিজেই নিজেকে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষণা করেছেন। এখন ইরানেও হামলার হুমকি দিচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হয়ে কার্যত নিজের মনমর্জি চালাচ্ছেন তিনি। আর এখন তাঁর নজর পড়েছে পৃথিবীর সবথেকে বড় দ্বীপ কিনে নিতে। অবাক লাগলেও, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সত্যিই গ্রিনল্যান্ডকে কিনে নিতে চাইছেন। এমনটা সম্ভব নাকি? চাইলেই কোনও দ্বীপ কিনে নেওয়া যায়? কেনই বা হঠাৎ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে মাথাব্যথা ট্রাম্পের?
গ্রিনল্যান্ড চাই। গ্রিনল্য়ান্ড কিনবেন ট্রাম্প। কিন্তু এটা মগের মুলুক নাকি? গ্রিনল্যান্ড স্বশাসিত দ্বীপ। চাইলেই তো আর কেউ নিতে পারে না। স্বাভাবিকভাবেই তারা আপত্তি জানিয়েছে। পাশাপাশি ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ব্রিটেন সহ একাধিক ইউরোপিয়ান দেশও রাজি নয় ট্রাম্পের এই অবাস্তব দাবিতে। ব্যস, রেগে কাঁই মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তাঁর প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় দিচ্ছেন শাস্তি। বসাচ্ছেন শুল্ক। ডেনমার্ক, ফ্রান্স, ব্রিটেন, নরওয়ে, জার্মানি, সুইডেন, নেদারল্যান্ড, ফিনল্যান্ডের উপরে ১০ শতাংশ করে শুল্ক বা ট্যারিফ বসানোর ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প। এই সমস্ত দেশ থেকে যা পণ্য আমদানি হয়, তার উপরে এই শুল্ক বসবে। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এই শুল্ক কার্যকর হবে। হুমকি দিয়েছেন যে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে কোনও চুক্তি না হলে, ১ জুন থেকে এই শুল্ক বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করে দেওয়া হবে।ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলি ট্রাম্পের এই আচরণে ক্ষোভে ফুঁসছে। আর মজা পাচ্ছে চিন-রাশিয়া।
এর সূত্রপাত কিন্তু বেশ কয়েকবছর আগে। ২০১৯ সালে ট্রাম্প হঠাৎ বলেছিলেন—আমরা গ্রিনল্যান্ড কিনতে আগ্রহী। “গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়” সাফ বলেছিলেন ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী। এরপর ট্রাম্প রাগে ডেনমার্ক সফর বাতিল করেন। অনেকে তখন এটাকে ঠাট্টা ভেবেছিল। কিন্তু আসলে এই প্রস্তাবের পেছনে লুকিয়ে ছিল বিশ্বশক্তির ভয়ঙ্কর অঙ্ক।
গ্রিনল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দ্বীপ। অথচ এর জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ৫৬ হাজার। ডেনমার্কের অধীনে স্বশাসিত অঞ্চল। বরফে ঢাকা এই দ্বীপটা দেখতে অত্যন্ত মনোরম, তবে আসলে এটি ভবিষ্যতের বিশ্ব রাজনীতির হটস্পট হতে চলেছে।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের এত আগ্রহের প্রধান কারণই হল এর অবস্থান। এটি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝখানে, আর্কটিক অঞ্চলের একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত। এবার এখানে কেন এত আগ্রহ ট্রাম্পের? কারণ বিশ্ব উষ্ণায়ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলছে গ্রিনল্যান্ডে, ফলে আর্কটিক দিয়ে নতুন শিপিং রুট খুলে যাচ্ছে। এরফলে কম সময়ে, কম খরচে, আরও বেশি বাণিজ্য করার সুযোগ। যে দেশ গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করবে,
তারাই ভবিষ্যতের এই রুটের নিয়ন্ত্রণ করবে।
গ্রিনল্যান্ডের সামরিক গুরুত্বও রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডে আগে থেকেই আছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থুল এয়ার বেস (Thule Air Base)। এখান থেকে রাশিয়ার মিসাইল কার্যকলাপ নজরদারি করা যায়। উত্তর দিক থেকে কোনও হামলা হলে আগেভাগে সতর্ক হওয়া যায়। তাই আমেরিকার দৃষ্টিতে গ্রিনল্যান্ড হল জাতীয় নিরাপত্তার চাবিকাঠি।
তবে ভুললে চলবে না, মার্কিন প্রেসিডেন্টের আগে থেকেই পোড় খাওয়া ব্যবসায়ী ট্রাম্প। আর আমেরিকাকে বিশ্বের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা বানাতে প্রয়োজন বিপুল খনিজ ভাণ্ডারের। সেই কারণেই গ্রিনল্যান্ড দরকার। কারণ এর বরফের নিচে লুকিয়ে আছে তেল ও গ্যাস। রয়েছে বিরল মৃত্তিকা মৌল (Rare Earth Minerals)। এছাড়া ইউরেনিয়াম, সোনা, লোহা, জিঙ্ক রয়েছে। রেয়ার আর্থ মিনারেল ছাড়া এখন মোবাইল থেকে ইলেকট্রিক গাড়ি, আধুনিক অস্ত্র-
কিছুই বানানো যায় না।
চিনের কাছে সবথেকে বেশি রেয়ার আর্থ মিনারেল আছে। গ্রিনল্যান্ডের এই খনিজেও আগ্রহ দেখাচ্ছিল, আর সেটাই আমেরিকাকে চিন্তায় ফেলেছিল।
ট্রাম্প যে যুক্তিটা গ্রিনল্য়ান্ডের উপরে অধিকার ফলানোর জন্য বলছে, তা হল চিন ও রাশিয়ার আধিপত্য। চিন চাইছে পোলাপ সিল্ক রোড (Polar Silk Road)। রাশিয়াও আর্কটিকে নিজের সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। ট্রাম্প আগেই বুঝেছিলেন, আজ যদি আমেরিকা পিছিয়ে থাকে, আগামী ২০–৩০ বছরে আর্কটিকের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে প্রতিদ্বন্দ্বী চিন-রাশিয়ার হাতে।
তারা আমেরিকার অংশ হতে চায় না। তবে ডেনমার্ক থেকেও পুরোপুরি আলাদা হতে চায়। শেষ পর্যন্ত কী হয়, ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড কিনবেন নাকি শক্তি প্রদর্শন করে দখল করে নেবেন, তাই-ই দেখার।