
আবার একটা যুদ্ধের মুখে বিশ্ব? আর এবারের যুদ্ধটা ছোটখাটো যুদ্ধ নয়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগতে পারে। ২০০৩-এর পর ২০২৬। ইরাক যুদ্ধের পর এবার টার্গেট ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় সেনা মোতায়েন করেছে আমেরিকা। সেই রণতরীর বহর শুনলে অবাক হয়ে যাবেন। প্রায় সবরকমের মার্কিন যুদ্ধবিমান, গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার এখন হয় ইরানের কাছে পৌঁছে গিয়েছে, নয়তো ইরান-মুখী। ট্রাম্প যেন স্থির করেই নিয়েছেন যে যুদ্ধ করবেনই। কিন্তু কেন এই যুদ্ধ করতে চাইছে আমেরিকা। আর এই যুদ্ধ হলে ভারতও কিন্তু জড়িয়ে পড়তে পারে।
আগে বুঝতে হবে যে কেন এই উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে?
১. পারমাণবিক কর্মসূচি ও ক্ষেপণাস্ত্র
ইরানের পারমাণবিক কর্মকাণ্ড ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিই মূল টানাপোড়েনের কারণ। আমেরিকার কথা, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র বানাবে না। আর ইরান বলছে তারা নিজেদের নিরাপত্তার জন্যল পারমাণবিক কাজ চালাবেই।
২. উত্তেজনার স্মৃতি
২০১৫ সালের JCPOA পারমাণবিক চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে আমেরিকা সরে যাওয়ার পর থেকে সংশয় ও বিবাদ আরও বাড়ছে। আমেরিকা নিজে পরমাণু শক্তি বা অস্ত্র নিয়ে কোনও নিয়মে বাঁধনে থাকবে না, কিন্তু ইরানের উপরে দাদাগিরি করছে যে তাদের কথা মতো চলতে হবে। পরমাণু অস্ত্র তৈরি করবে কি না, তা ঠিক করে দেবে আমেরিকা।
৩. হরমুজ প্রণালি
এই অঞ্চলের সরু জলপথ হরমুজ প্রণালি বিশ্ব তেলের চলাচলের অন্যতম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পথ। উত্তেজনার সময় ইরান এই প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। বিশ্ব বাজারে জ্বালানি মূল্য ওঠানামা করে এই রুটের উপরে।
যুদ্ধ যাতে না বাধে, তার জন্য ইরান ও মার্কিন প্রতিনিধিদের নিয়ে জেনেভার বৈঠক হয়েছে, কিন্তু তা ফলপ্রসূ হয়নি। ট্রাম্প-ও আর সময় দিতে নারাজ। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি খুব চেষ্টা করছেন যুদ্ধ এড়াতে। কিন্তু সেটা আর সম্ভব নাও হতে পারে।
ডেডলাইন বেঁধে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আগামী দু সপ্তাহের মধ্যে ইরান পরমাণু গবেষণা না থামালে, তেহরানে অভিযান চালাবে মার্কিন সেনা। সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ট্রাম্পের চূড়ান্ত নির্দেশের অপেক্ষা করছে স্পেশ্যাল ফোর্স। ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-কে এবং তাঁর ছেলেদের নিকেশের নির্দেশ সেনার কাছে রয়েছে। ইরান যদি ট্রাম্পের মন রাখার মতো চুক্তি নিয়ে আলোচনার টেবিলে না বসতে পারে, তাহলে সেনা তৈরিই রয়েছে। সেনার অন্যতম টার্গেট হবে, আয়াতোল্লা খামেনেই ও তাঁর চার পুত্র সন্তান। প্রয়োজনে ইরানের সরকার পাল্টানো-র পরিকল্পনাও তৈরি। তার জন্য বাকি মোল্লাহদেরও নিকেশ করা হতে পারে।
বল এখন ইরানের কোর্টে। ট্রাম্প স্পষ্ট করেই দিয়েছেন, ইরানকে এখনই পরমাণু সংক্রান্ত সব গবেষণা বন্ধ করতে হবে। নইলে আগামী সপ্তাহের শেষেই ইরানের পরমাণু গবেষণা ঘাঁটি, অস্ত্রাগার ও সেনা পরিকাঠামোকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে যুদ্ধের জন্য তো সামরিক বহরের দরকার। এখনই ইরানের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ২টি এয়ারক্রাফট কেরিয়ার, ১২০টি যুদ্ধবিমান, অন্তত ১৭টি যুদ্ধজাহাজ। আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যে তো নয়, ইরানে আঘাত হানতে ব্রিটেন, গ্রিস, বুলগেরিয়ার মতো ঘাঁটিতেও মোতায়েন রয়েছে একাধিক ভয়ঙ্কর বোমারু বিমান ও যুদ্ধবিমান। শুধু মধ্য প্রাচ্যেই নয়, ইউরোপের একাধিক সেনাঘাঁটিতে মোতায়েন রয়েছে ভারী বোমা বহনকারী বিমান। ইরানের আশেপাশে মার্কিন সেনাঘাঁটিতে নিয়মিত মহড়া চালাচ্ছে ফাইটার জেট।
আশঙ্কা, খামেনেই সরকারকে উৎখাতে আমেরিকা-ইজরায়েল একযোগে হামলা চালালে এগিয়ে আসতে রাশিয়া ও চিন। সেক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে বেঁধে যেতে পারে। ইতিমধ্যেই রুশ অস্ত্র ও চিনা প্রযুক্তি তেহরানে নিয়মিত সরবরাহ হচ্ছে বলে খবর সামনে এসেছে।
এদিকে, ট্রাম্প যতই নেতানিয়াহুকে সঙ্গে নিয়ে ইরানকে হুমকি-হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, ততই ইরান-ও যেন বেঁকে বসছে। দুপক্ষের কেউ-ই একচুলও পিছিয়ে আসতে রাজি নয়। ইরানি সেনাকর্তারা প্রকাশ্যেই হুমকি দিচ্ছে ট্রাম্পকে। হাজার হাজার ব্যালিস্টিক, ক্রুজ মিসাইল, সোয়ার্ম ড্রোন লুকিয়ে রাখা ইরানের আন্ডারগ্রাউন্ড বাঙ্কারে। স্যাটেলাইট ছবি জানান দিচ্ছে, ইতিমধ্যেই পরমাণু গবেষণা ঘাঁটিগুলির খোলা মুখ মাটি, পাথর দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে ইরানি সেনা। বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগাছি সেনাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
গতবছর আমেরিকা-ইজরায়েলের হামলা থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ অন্তত পাঁচটি ‘আন্ডারগ্রাউন্ড মিসাইল’ সিটি বানিয়েছে তেহরান। বন্দুকের ম্যাগাজিন থেকে যেভাবে পরপর গুলি বেরোয়, ঠিক একইভাবে এই আন্ডারগ্রাউন্ড ফেসিলিটিতে ‘মিসাইল ম্যাগাজিন’ বানানো রয়েছে। সেমি-অটোমেটিক সিস্টেমের সাহায্যে সেখান থেকে কয়েক সেকেন্ড অন্তর অন্তর মিসাইল ছোঁড়া যাবে ইরানের শত্রুদের বিরুদ্ধে। পণ্যবাহী ট্রেনের কামরা খালি করে সেগুলিতে এখন মিসাইল ঠেসে ভরে রেখেছে ইরানি সেনা।
এর মাঝে আবার প্রধানমন্ত্রী মোদী ২৫ ফেব্রয়ারি ইজরায়েল সফরে গিয়েছেন। ইজরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে একাধিক চুক্তি বা মউ স্বাক্ষর হতে পারে। ইজরায়েল আমেরিকার বন্ধু দেশ। তারা ইরানের কট্টর বিরোধী। গত বছরই সংঘাত বেধেছিল। এদিকে আবার ইরানের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক ভারতের। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তিও প্রায় চূড়ান্ত। মোদী ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব সকলের জানা। এই টানাপোড়েন পরিস্থিতিতে ভারত কোনদিকে ঝোঁকে, সেটাও দেখার। বলাই চলে, তিন নৌকায় পা দিয়ে চলছেন মোদী।
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু হেক্সাগন অ্যালায়ন্স তৈরি করার কথা বলেছেন। জানিয়েছেন, তাঁর এই হেক্সাগনে ভারত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হবে। গ্রিস ও সাইপ্রাসের মতো দেশও এর সদস্য হবে। আরবের একাধিক দেশ, আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশও এই গোষ্ঠীর সদস্য বা অংশ হতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে নেতানিয়াহুর বিবৃতিতে। মূলত শিয়া মুসলিম এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত হামাস, হিজবুল্লাহ, হুথিদের বিরুদ্ধে গোষ্ঠী তৈরি করতে চান নেতানিয়াহু। যদিও ভারত এই নিয়ে কোনও বিবৃতি দেয়নি।
শেষ পর্যন্ত আমেরিকার সঙ্গে ইরান যুদ্ধের পথে হাঁটে কি না, তাই দেখার। বারুদের স্তূপ তৈরি হয়েই রয়েছে। কোনও একপক্ষ সামান্য ফুলকি ধরালেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। আর এটাই হতে পারে বিশ্বের শেষ মহাযুদ্ধ-ও।মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা অনিশ্চিত হওয়ায় তেলের মূল্য ও বাজার অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। বদলাতে পারে বিশ্বশক্তির ইক্যুয়েশনও।