Explained: মুখোমুখি ইরান-আমেরিকা, হরমুজ প্রণালি বন্ধের আশঙ্কা বিশ্বজুড়ে

Iran vs US: প্রায় তিনটি ফুটবল মাঠের সমান বড়, পরমাণু জ্বালানি চালিত মার্কিন রণতরী 'আব্রাহাম লিঙ্কন' সদলবলে ইরানের খুব কাছে দাঁড়িয়ে। ইরান পাল্টা হরমুজ প্রণালিতে পাঁচদিনের যুদ্ধ মহড়া শুরু করছে। 'যুদ্ধবাজ আমেরিকার উসকানি মধ্যপ্রাচ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ডেকে আনবে।' ৮৬ বছরের খামেনেইয়ের হুঁশিয়ারি, 'তেহরান যুদ্ধের আগুন ট্রাম্পের ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে।'

Explained: মুখোমুখি ইরান-আমেরিকা, হরমুজ প্রণালি বন্ধের আশঙ্কা বিশ্বজুড়ে

| Edited By: Purvi Ghosh

Feb 02, 2026 | 9:58 PM

ইরান-রাশিয়ার বদলে এবার কি ভেনেজুয়েলার তেল কিনবে ভারত? এই নিয়েই এখন সরগরম আন্তর্জাতিক রাজনীতি। যদিও সাধারণ বাজেট পেশের দিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই নিয়ে মুখ খোলেননি। কিন্তু ট্রাম্পের বক্তব্যকে হাতিয়ার করে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে আক্রমণ বানিয়েছে বিরোধিরা। ‘গ্লোবাল অয়েল লাইফলাইন’ বলে পরিচিত হরমুজ প্রণালি এখন কার্যত রণভূমি। এই পথে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইরান ও মার্কিন সেনার রণতরী। গত ৩৭ বছর ধরে ইরানের সুপ্রিম লিডার আলি খামেনেই নতুন করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্পকে। ‘যুদ্ধবাজ আমেরিকার উসকানি মধ্যপ্রাচ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ডেকে আনবে।’ ৮৬ বছরের খামেনেইয়ের হুঁশিয়ারি, ‘তেহরান যুদ্ধের আগুন ট্রাম্পের ঘরের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হবে।’

হুমকি-পাল্টা হুমকিতে মধ্য প্রাচ্যে এখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণহুঙ্কার! প্রায় তিনটি ফুটবল মাঠের সমান বড়, পরমাণু জ্বালানি চালিত মার্কিন রণতরী ‘আব্রাহাম লিঙ্কন’ সদলবলে ইরানের খুব কাছে দাঁড়িয়ে। ইরান পাল্টা হরমুজ প্রণালিতে পাঁচদিনের যুদ্ধ মহড়া শুরু করছে। হরমুজ থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে আব্বাস বন্দরে শতাধিক দ্রুতগতির, মিসাইল-বাহী স্পিডবোট, শাহিদ বাঘেরি ড্রোন-কেরিয়ার দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাত্র ৩৩ কিলোমিটার চওড়া হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচলের লেন কোনওটা মাত্র ৩ কিলোমিটার চওড়া। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এই সরু জলপথের উপরেই বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় ২৫% নির্ভর করে। সেই হরমুজ-ই এখন যেন রণক্ষেত্র। ইরানি সেনা সেখানে যুদ্ধের মহড়া চালাচ্ছে। তাদের সাহায্যে এসেছে চিনা রণতরী। ফলে ইরান এখন নতুন করে কনফিডেন্স পেয়েছে। পাল্টা মার্কিন সেনা হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে, ইরান একটুও বাড়াবাড়ি করলে যুদ্ধ অনিবার্য। একটাও গুলি কোনও তেলবাহী জাহাজের গায়ে লাগলে ফুল ভুগতে হবে তেহরানকে।

ওই যে, কথায় বলে না, হিস্ট্রি রিপিট ইটসেলফ। এই একই পরিস্থিতি গতবছরের জুনেও তৈরি হয় হরমুজে। সেবার ইরান ও ইজরায়েলের ১২ দিন ব্যাপী যুদ্ধে এই রাস্তা বন্ধ হতে বসেছিল। শেষ পর্যন্ত মার্কিন সেনা ইজরায়েলকে নিয়ে তিনটি ইরানি পরমাণু ঘাঁটিতে বোমা ফেলে ইরানকে ওই জলপথ খোলা রাখতে বাধ্য করে। আসলে, এই পথেই সৌদি, ইরাক, কাতার, ইরান ও কুয়েতের সিংহভাগ তেল রপ্তানি হয়। এই প্রণালি বন্ধ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে চিন এবং এশিয়াকে। বাদ যাবে না ভারতও। তবে চিন ও ভারতের জন্য অবশ্য বিকল্প উপায় বাতলেছেন ট্রাম্প-ই। হোয়াইট হাউস থেকে সদ্য মুক্তি পাওয়া ট্রাম্পের এক অডিও বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেছেন, ভারত এখন থেকে মার্কিন অধিকৃত ভেনেজুয়েলার তেল কিনতে রাজি। চিনকেও একই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ইরান বা রাশিয়ার থেকে নয়, এখন থেকে আমেরিকার সঙ্গে নয়া চুক্তিমাফিক কারাকাসের তেল কিনবে ভারত। বিদেশমন্ত্রক অবশ্য এই নিয়ে একটাও শব্দ খরচ করেনি। বাজেট পেশের দিন চুপ মোদিও। প্রধানমন্ত্রীর নীরবতাকে হাতিয়ার করে কেন্দ্রকে আক্রমণ শানিয়েছে কংগ্রেস। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশের অভিযোগ, অপারেশন সিঁদুর সাময়িক রদ হওয়া থেকে থেকে রুশ তেল কেনা বন্ধ করা — ভারতের সব সিদ্ধান্ত কেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে জানতে হবে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আবার এই মুহূর্তে ইরানকে কার্যত অবরুদ্ধ করে রেখেছেন তাঁর সবচেয়ে ঘাতক আর্মাডা পাঠিয়ে। USS আব্রাহাম লিঙ্কন ছাড়াও গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ফ্র্যাঙ্ক পিটারসন, মাইকেল মারফি, ডেলবার্ট ব্ল্যাক, USS ম্যাকফল ও USS মিশার দাঁড়িয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালিতে। প্রতি রণতরীই ভয়ানক যুদ্ধ করতে পারে। এতে রয়েছে ঘাতক সব অস্ত্র, মিসাইল এমনকী শখানেক আস্ত যুদ্ধবিমানও। ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, USS আব্রাহাম লিঙ্কনের নেতৃত্বে মধ্য প্রাচ্যে পাঁচদিনের যুদ্ধের মহড়া চালাবে মার্কিন নৌ ও বায়ুসেনা। মহড়া ঠিক কোথায় হবে, সেটা গোপন রেখে মার্কিন সেনার সেন্ট্রাল কমান্ড আশেপাশের বিশাল এলাকা জুড়ে ‘নোটাম’ জারি করে রেখেছে। শুধু আব্রাহাম লিঙ্কন রণতরী-তেই রয়েছেন প্রায় ৫০০০ নৌসেনা ও কর্মী। নতুন করে আবার ‘এফ-১৫’ স্ট্রাইক ঈগল ফাইটার জেট-ও এখন হরমুজ কাছে উড়ছে। ব্রিটিশ সেনা তাদের ‘টাইফুন’ জেট পাঠিয়েছে আমেরিকাকে সাহায্য করতে।

ওই এলাকাতেই আবার ইরান শুরু করেছে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় যুদ্ধের মহড়া। মহড়ার অংশ হিসাবে ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোর বা IRGC-র নৌসেনা অবিরত গুলি চালাচ্ছে স্পিডবোট থেকে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, USS আব্রাহাম লিঙ্কনের উপরে একযোগে হাজার হাজার সোয়ার্ম ড্রোন অ্যাটাক করতে পারে তেহরান। তারও নাকি প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যেই U.S. Central Command বা CENTCOM কড়া সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, এই ধরণের বিপজ্জনক ও অপেশাদারি আচরণ সংঘাত ডেকে আনতে পারে। পাল্টা ইরান আবার এই মহড়ায় ডেকে আনছে রাশিয়া ও চিনকেও। ফেব্রুয়ারির মাঝমাঝি থেকেই শুরু হয়ে যাবে ‘Joint Maritime Security Belt exercise’। এখন দেখার, আমেরিকা ও ইজরায়েল কীভাবে এই যৌথ সামরিক মহড়াকে সামাল দেয়। তবে মার্কিন সেনা ট্রাম্পকে জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের বদলে ইরানের সামরিক ঘাঁটিগুলিতে হামলা চালিয়ে সর্বোচ্চ নেতা খামেনেই-এর গদি উল্টানো সম্ভব। ইজরায়েলও সাহায্য করবে আশ্বাস দিয়েই রেখেছে। পাল্টা ইরানের হুঁশিয়ারি, তেহরানে হামলা চালালে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হবে। উড়িয়ে দেওয়া হবে ইরানের আশেপাশের সমস্ত মার্কিন সেনাঘাঁটি। ইরানি সেনাপ্রধান আমির হাতামি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, ‘আমেরিকা যুদ্ধ চাইলে ইরান যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। বোমা ছুঁড়লে জবাব বোমাতেই পাবে আমেরিকা।’ দেশের সেনা সবরকমভাবে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন মেজর জেনারেল হাতামি। কারও চাপে ইরান তাদের পারমাণবিক গবেষণা থামাবে না বলেও ওয়াশিংটনের রক্তচাপ বাড়িয়েছেন ইরানি সেনাপ্রধান। তার জন্য দেশের বিজ্ঞানীরা শহিদ হতেও প্রস্তুত বলে মন্তব্য করেন মেজর জেনারেল হাতামি।