
ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে জ্বালানি তেল বোঝাই ট্যাঙ্কার ‘বাঁচাতে’ নিজের সবচেয়ে মারণ সাবমেরিনকে আটল্যান্টিক মহাসাগরে নামালেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। মার্কিন সেনার রণতরী লাগাতার ওই ‘শ্যাডো ফ্লিট’-কে নিশানা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। ট্রাম্পের রোষানল থেকে ওই শ্যাডো ফ্লিট-কে বাঁচাতে ‘পোসেইডন’ নামের পরমাণু বোমা-সহ রুশ সাবমেরিন ‘বেলগরদ’ এখন আটলান্টিকে টহল দিচ্ছে। আবার এই খবর প্রকাশ্যে আসতেই পাল্টা ন্যাটোর একঝাঁক যুদ্ধবিমান ছুটে গেল রুশ সাবমেরিনকে ঠেকাতে। সবমিলিয়ে এখন বারুদের স্তূপের উপর দাঁড়িয়ে দুপক্ষ-ই।
যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, ইরানের তেল বোঝাই রুশ পতাকা লাগানো বিমানে নামতে শুরু করেছে মার্কিন সেনা, আরও সেনা যাচ্ছে। রুশ সাবমেরিন পৌঁছতে পারেনি।
— U.S. European Command (@US_EUCOM) January 7, 2026
এই জটিল পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে হলে আগে জানতে হবে, কী এই ‘শ্যাডো ফ্লিট’? শ্যাডো বা ডার্ক ফ্লিট হল একগুচ্ছ ছোট ছোট জাহাজ। মূলত জ্বালানি তেল বহনকারী। এই তেলের জাহাজগুলিকে রক্ষা করতে তাদের ঘিরে থাকে কয়েকটি ছোট হামলাকারী জাহাজও। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে (পড়ুন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে), জলপথে এক দেশ অন্য দেশের সঙ্গে তেল কেনাবেচা করে এই ‘শ্যাডো’ বা ‘ডার্ক’ তেল ট্যাঙ্কারগুলির মাধ্যমে। এই সম্মিলিত জাহাজগুলিকেই একত্রে বলে ‘শ্যাডো ফ্লিট’। মূলত রাশিয়া বা ইরানের কাছ থেকে তেল কিনতেই বিভিন্ন দেশ এই ‘শ্যাডো’ ফ্লিটের উপর ভরসা করে। কারণ, ওই দুই দেশের তেল বিক্রির উপরেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লাগু রয়েছে। সোজাপথে রাশিয়া বা ইরানের কাছ থেকে কোনও তৃতীয় দেশ তেল কিনলে ট্রাম্পের রোষে পড়তে পারে। সেই জটিলতা থেকে বাঁচতেই এই শ্যাডো ফ্লিটের রমরমা আন্তর্জাতিক জলপথে। এই শ্যাডো ফ্লিট-কে অন্যান্য পণ্যবাহী জাহাজের মতো সহজে ট্র্যাক করা যায় না । কারণ, এদের ট্র্যাকিং সিগন্যাল অধিকাংশ সময়ই বন্ধ করা থাকে। বিতর্কিত বা বিবাদমান জলসীমায় এই শ্যাডো ফ্লিট ‘অপারেট’ করে। এই জাহাজগুলির মালিকানার কাগজ অধিকাংশ সময়ই জাল হয়। যাতে কে কার কাছ থেকে তেল কিনছে– পরে কখনও তার কোনও ইতিহাস খুঁজে বার করা সম্ভব না হয়। এক্ষেত্রে, এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে সরাসরি তেল পাঠানো হয়। কোনও স্থায়ী বন্দরে কখনই এই ধরণের ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নোঙর ফেলে না।
এই মুহূর্তে আটলান্টিকে ঠিক এরকমই একটি ‘শ্যাডো ফ্লিট’কে গরু খোঁজা খুঁজছে মার্কিন সেনা। ওই জাহাজে ইরানের তেল বোঝাই রয়েছে বলে গোপন সূত্রে খবর পেয়েছেন মার্কিন গোয়েন্দারা। কিছুদিন আগে ওই জাহাজে করে ভেনেজুয়েলার তেল-ও পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ। খুঁজে পেলেই জাহাজটি ধ্বংস করতে পারে মার্কিন সেনা। বা জাহাজটির দখল নিতে পারে। তাই এবার ওই জ্বালানি তেল বোঝাই ট্যাঙ্কারটি ‘বাঁচাতে’ মরিয়া পুতিন নিজের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সাবমেরিনকে আটলান্টিকে পাঠিয়েছেন। এ খবর নিশ্চিত করেছে বিবিসি ও সিবিএস-এর মতো সংবাদমাধ্যম। মার্কিন উপকূলরক্ষী বাহিনী অন্তত গত এক মাস ধরে ওই জাহাজটিকে আটক করার চেষ্টা চালাচ্ছে। পাল্টা ক্রেমলিন-ও জানিয়েছে, উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দিকে তারাও কড়া নজর রাখছে। সূত্রের খবর, বর্তমানে খতরনাক রুশ সাবমেরিন-টি আইসল্যান্ডের ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণে নর্থ আটলান্টিকের কাছে রয়েছে।
কতটা বিপজ্জনক ও মারণক্ষমতা সম্পন্ন ওই রুশ সাবমেরিন? এবার সেটা বিশদে জানা যাক। K-329 Belgorod একটি পারমাণবিক জ্বালানিতে চলা ডুবোজাহাজ। আন্তর্জাতিক জলসীমাতে রুশ নৌসেনাকে ‘অপারহ্যান্ড’ দিতেই ২০২২ থেকে এই জাহাজটি ব্যবহার করে ক্রেমলিন। পারমাণবিক হামলায় সক্ষম। সাধারণত, প্রশান্ত মহাসাগরে রুশ নৌসেনার জন্য মোতায়েন থাকে। এর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অস্ত্রের নাম ‘পোসেইডেন’। এটি পরমাণু অস্ত্র বহনকারী এক ধরনের বিশেষ টর্পেডো। বিশ্বের দীর্ঘতম। এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে হামলাকারী ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইলের ক্ষমতাসম্পন্ন, তাও আবার ‘আনম্যান্ড’। মানে, চালাতে ম্যানুয়ালি কোনও সেনার দরকার নেই। ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে। বিশ্বের কোনও ডিফেন্স সিস্টেম-ই একে থামাতে পারে না বলে দাবি করে মস্কো। জলের নিচে ১০০ ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে এই টর্পেডো। এই টর্পেডোর ভিতরেও একটি ছোট পরমাণু জ্বালানি-সমৃদ্ধ ইঞ্জিন থাকে। যা একে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৮৫ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিবেগে ছুটতে সাহায্য করে। ধ্বংসলীলা চালানোর ক্ষমতার জন্যই এই টর্পেডোর নাম রাখা হয়েছে গ্রীক দেবতা পোসেইডেনের নামে। যিনি সমুদ্র, ভূমিকম্প ও ঝড়ের দেবতা বলে পরিচিত। ওই রুশ সাবমেরিন-ই এখন ইরানের তেল বোঝাই শ্যাডো ফ্লিট-কে নিরাপত্তা দিচ্ছে বলে অভিযোগ।
মার্কিন সেনা সূত্রে খবর, সেনার স্পেশ্যাল ফোর্স এখন ওই শ্যাডো ফ্লিট-এ ওঠার চেষ্টা করছে। তবে জ্বালানি বোঝাই জাহাজটিতে রুশ পতাকা লাগানো আছে বলে মস্কো টাইমস-এর খবর। শ্যাডো ফ্লিট-টির নাম ‘মারিনারা’।