
রণক্ষেত্র ইরান! বাগযুদ্ধে জড়ালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনেই। দুজনেই একে অপরকে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন। ট্রাম্প যে কোনও সময় সেনা-হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। পাল্টা খামেনেই-ও ট্রাম্পকে পরাজিত, অত্যাচারী শাসক বলে তোপ দেগেছেন।
ইরানে খামেনেই-বিরোধী আন্দোলন দিনদিন আরও তীব্র হচ্ছে। দেশ-জুড়েই ইন্টারনেট, টেলিফোন পরিষেবা স্তব্ধ করে রেখেছে সরকার। তা সত্ত্বেও সরকারি দমনপীড়ন, জরুরি জিনিসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভে রাশ টানা যাচ্ছে না। ইরান থেকে বহিষ্কৃত নেতা রেজা পহেলভিকে ফিরিয়ে আনার দাবি তীব্র হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের সঙ্গে কথাও হয়েছে পহেলভির। ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি। ট্রাম্পও জানিয়ে রেখেছেন, আন্দোলনকারীদের উপরে এভাবে গুলি চালিয়ে গেলে তাঁর সরকার চুপ করে বসে থাকবে না। ইরানে সেনা পাঠাবে। এমন জোরাল আঘাত হানবে যে তেহরানের শাসকরা আজীবন মনে রাখবে।
ধনকুবের উদ্যোগপতি ইলন মাস্কের ‘স্টারলিংক’ পরিষেবা তেহরানে চালুর পক্ষেও সওয়াল ট্রাম্পের। এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে ট্রাম্পের চূড়ান্ত সাবধানবাণী- ‘কঠিন সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছি, দ্রুতই দেখতে পাবেন কী হয়।’ ইরান অবশ্য বৈঠক করতে চেয়ে ইতিমধ্যেই তাঁর হাতেপায়ে ধরছে বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প। যদিও ট্রাম্পের দাবি উড়িয়ে ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি– সরকার ফেলতে দেশের ভিতরে বিক্ষোভে ইন্ধন জোগানোর মূল্য চোকাতে হবে ট্রাম্পকে।
দেশের সরকারি টিভিতে বসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই ট্রাম্পকে তুলোধোনা করেছেন। ট্রাম্পকে অত্যাচারী পরাজিত শাসক বলে মন্তব্য করে খামেনেইয়ের মন্তব্য, ‘একজন অযোগ্য শাসক। নিজের দেশ সামলাক আগে।’ খামেনেইয়ের দাবি, আন্দোলনে দ্রুতই রাশ টানবে সরকার। যদিও সে লক্ষণ এখনই দেখা যাচ্ছে না। ইরানে বিক্ষোভ দমাতে পুলিশ-সেনা নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে বলে অভিযোগ। শুধুমাত্র তেহরানেই ২০০-রও বেশি বিক্ষোভকারী মারা গেছেন বলে সূত্রের খবর। গতবছরের ২৮ ডিসেম্বর থেকে খামেনেই-বিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ইরান। ৮ জানুয়ারি থেকে ইরান জুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ, বন্ধ টেলিফোনও। ইরানে অশান্তির ঢেউ এসে লেগেছে মার্কিন মুলুকের লস এঞ্জেলসেও। ইরানের প্রতিবাদকে সমর্থন জানিয়ে মিছিলে বেরিয়েছিল শহরে। ওই ভিড়ে ঠাসা মিছিলের মধ্যেই বেপরোয়া গতিতে ট্রাক চালিয়ে একের পর এক সমর্থকদের ধাক্কা মারতে থাকে এক ব্যক্তি। তবে হতাহতের খবর নেই, আটক করা হয়েছে ট্রাকের চালককে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানে হামলার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তার পাল্টা ইরান-ও সতর্ক করেছে ওয়াশিংটনকে। হামলা হলে, প্রত্যাঘাতের ক্ষমতা তেহরানের রয়েছে। এই ভাষাতেই আমেরিকা ও ইজরায়েলকে একযোগে নিশানা করেছেন ইরান পার্লামেন্টরের স্পিকার মহম্মদ বাকার কালিবাফ। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকা যেন ভুলেও এই পদক্ষেপ না করে। ‘ট্রাম্প চূড়ান্ত মিস-ক্যালকুলেশন করে ফেলেছেন’, মন্তব্য ইরানি স্পিকারের। আমেরিকা একবার ইরান আক্রমণ করলে, ইজরায়েলে যত মার্কিন সেনাঘাঁটি ও রণতরী রয়েছে, সব হামলায় গুঁড়িয়ে দেওয়া বলেও হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কোরের প্রাক্তন কমান্ডার।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান-ও সরকারি টিভিতে বসে বিস্ফোরক দাবি করেছেন। বলেছেন, ইরানকে অশান্ত করার পিছনে আমেরিকা ও ইজরায়েলের প্রত্যক্ষ মদত রয়েছে। দেশের মানুষকে এই বিক্ষোভ থেকে দূরে থাকারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বেসরকারি সূত্রের দাবি, এই মুহূর্তে ইরানের অন্তত ২০ লাখ বিক্ষোভকারী ১৮০টি শহরে সবমিলিয়ে ৫১২টি শহরে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, রবিবার পর্যন্ত সরকার-বিরোধী বিক্ষোভে অন্তত ১০৯ জন নিরাপত্তারক্ষী মারা গেছেন। শুধু ইসফাহানেই একদিনে ৩০ জন পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষী মারা গেছেন। কারমানশাহতে সাম্প্রতিক দাঙ্গায় নিহত হয়েছেন আধডজন পুলিশকর্মী, দাবি রাষ্ট্রীয় ইরানের টিভির। পূর্ব ইরানের মাশাদের কাছে মসজিদে হামলা চালিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। ইরানে জিনিসপত্রের আগুনছোঁয়া দাম, সরকারি দফতরে বেলাগাম দুর্নীতি, জীবনযাপনের মানের অবনতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে বেনজির বিক্ষোভে শামিল হয়েছে নব্য প্রজন্ম। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ছবিতে আগুন ধরিয়ে প্রতিবাদ চলেছে। সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বিক্ষোভকারীদের চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে, বহিরাগত শক্তির মদতে ইরানে সরকার বিরোধী বিক্ষোভে শামিল হলে মৃত্যুদণ্ড পেতে হবে। একই সাবধানবাণী শুনিয়ে রেখেছেন সে দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল-ও।
ইরানের খামেনেই-বিরোধী বিক্ষোভ এমন আকার নিয়েছে, যে বিক্ষোভকারীরা সরকারি অফিসারদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারারও অভিযোগ উঠে গেছে। সে দেশের এক শীর্ষ পুলিশ অফিসার আলি লারিজানি-র দাবি, ISIS-এর ধাঁচে ইরানে সরকারি অফিসারদের পিটিয়ে, পুড়িয়ে মারছে বিক্ষোভকারীরা। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান আহমাদিয়ান মনে করতে পারছেন না, শেষ কবে তেহরানে এইরকম সহিংস আন্দোলন দেখেছেন। গত ২ সপ্তাহ ধরে সরকার-বিরোধী বিক্ষোভ আচমকাই যেন অতিরিক্ত হিংস্র হয়ে উঠেছে বলে তাঁর দাবি। তাঁর বক্তব্য, ইরানের বেশিরভাগ মানুষ-ই যেমন সরকারের উপর খুশি নন, তেমনই দেশের সরকারি সম্পত্তি লাগামহীন ভাবে ধ্বংস করে, পুলিশকর্মীদের পুড়িয়ে মারারও পক্ষপাতী নন।
ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্যও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বিক্ষোভকারীদের নির্বিচারে হত্যা করা হলে আমেরিকাও চোখ বুজে থাকবে না, মন্তব্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ট্রাম্প বলে রেখেছেন, কোনও সেনা অভিযান নয়, প্রয়োজনে ইরানকে সর্বোচ্চ জোরাল আঘাত করা হবে। তাহলে কি ফের ইরানে অভিযান চালাবে আমেরিকা? গতবছরের জুনে ইজরায়েল আচমকাই ইরানে হামলা চালায়। দুই যুযুধান দেশ ১২ দিনের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আমেরিকার হস্তক্ষেপ করে। ইরানের পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিতে হামলা চালায় মার্কিন ও ইজরায়েলি বায়ুসেনা। যুদ্ধে ইরানের শীর্ষ সেনাকর্তা-সহ পরমাণু বিজ্ঞানীরা মারা যান। পাল্টা ইজরায়েলের দিকে একের পর এক ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুঁড়ে হার না মানার মনোভাব দেখায় তেহরান-ও।